বাসস
  ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:১৪

জন্মের পরপরই শিশুর থাইরয়েড পরীক্ষা জরুরি

প্রতীকী ছবি

ঢাকা, ২ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস) : মা সাবিনার কোলে বসা শিশু মৌমিতা (১) জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিল। 

চিৎকার করে কান্না করছিল। কাছে গিয়ে কারণ জিজ্ঞেস করতেই জানা গেলো, শিশুটি জন্মগতভাবে থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছে। যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিসে আক্রান্ত হয়েছে তার সন্তান। 

শিশুটির মা সাবিনা জানান, অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসা করতেই রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বারডেম জেনারেল হাসপাতালের মা ও শিশু বিভাগে টিকিট কেটে সিরিয়াল দিয়ে চিকিৎসকে দেখানো জন্য অপেক্ষায় বসে আছেন। সাবিনার মতো প্রতিদিন গড়ে আট থেকে দশজন থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত শিশু-কিশোরদের স্বজনরা এখানে চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। সরেজমিন সেগুনবাগিচার বারডেম হাসপাতালে অভিভাবকদের সাথে 
কথা বলে জানা যায়, থাইরয়েড সমস্যার কারণে একেকটি শিশু নানা ধরনের শারীরিক জটিল সমস্যায় ভুগছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, জন্মের পর সাধারণত প্রথম তিন বছরে একটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পন্ন হয়, যার বেশির ভাগই ঘটে প্রথম বছরে। শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি আর মানসিক বিকাশে থাইরয়েড হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এ সময় কোনো কারণে থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি হলে শিশুটি শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী হিসেবে বেড়ে ওঠে। একেই কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজম বলে। 

সাধারণত দেখা যায়, একটি শিশুর থাইরয়েড গ্রন্থি পুরোপুরি গঠিত না হলে বা হরমোন তৈরিতে সমস্যা হলে কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজম হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়, থাইরয়েড সংক্রামক নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা বংশানুক্রমিক। জিনগতভাবে প্রতি ২ হাজার ৩০০ জনে ১ জন থাইরয়েড শিশুর জন্ম হচ্ছে। বাবা-মায়ের থাকলে তাদের থেকে জন্ম নেওয়া শিশুর আক্রান্তের ঝুঁকি ৭০ শতাংশ। অন্যদিকে প্রতি ১০ জন নারীর ১ জন এ রোগে ভুগছেন। তাদের প্রধান কারণ, আয়োডিনের ঘাটতি ও নিজের নানা শারীরিক দুর্বলতা। গবেষণা থেকে থেকে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে আবার বাচ্চাদের শরীরে আয়োডিনের অভাব থাকলেও থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিতে পারে। আয়োডিন থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনে সাহায্য করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে কোনও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণ কমে যেতে পারে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। 

এমন ঘটনা নবজাতকের মধ্যে দেখা না গেলেও, ছোট বাচ্চাদের মধ্যে ঘটে থাকে। মাতৃগর্ভে থাকতেই শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য এই হরমোন দরকার, তাই প্রত্যেক গর্ভবতী মায়ের থাইরয়েড সমস্যা আছে কিনা, তা জানা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা করা আবশ্যক।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, উন্নত বিশ্বে শিশুর জন্মের পরপরই থাইরয়েডের পরীক্ষাটি বাধ্যতামূলক। 

আমাদের দেশেও কোনো কোনো হাসপাতালে শিশুর জন্মের পরপরই থাইরয়েড পরীক্ষা করানো হয়। তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে জন্মের পরপরই শিশুর থাইরয়েড পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা অতি জরুরি। রোগ নির্ণয় হলে দ্রুত ওজন অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগ, নিয়মিত ফলোআপ আর প্রয়োজনমতো ওষুধের মাত্রা পরিবর্তনের মাধ্যমে পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। 

প্রয়োজন শুধু একটুখানি সদিচ্ছা আর সচেতনতা।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, শিশুদের থাইরয়েডের সমস্যা হলে থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন নিঃসৃত হয় না, অর্থাৎ থাইরয়েড গ্রন্থি কাজ করতে পারে না। ফলে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বুদ্ধির বিকাশ, উচ্চতা ও নিউরোলজিক্যাল বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এর প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে, অতিরিক্ত ঘুম, খেতে অনীহা, ওজন হঠাৎ বৃদ্ধি, জন্মের পর দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিস ইত্যাদি। তিনি আরো বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ৬০ ভাগই চিকিৎসা আওতার বাইরে রয়েছেন। জীবনে চারটি সময়ে অবশ্যই থাইরয়েড স্ক্রিনিং করা প্রয়োজন। প্রথমত, জন্মের পরপরই, দ্বিতীয়ত, বয়ঃসন্ধিকালে, তৃতীয়ত, মায়েদের গর্ভধারণের আগে এবং চতুর্থত, বয়স ৪০ হওয়ার পর থাইরয়েড স্ক্রিনিং প্রয়োজন। থাইরয়েড রোগ বিস্তারে বংশগত প্রভাব রয়েছে। চিকিৎসার জন্য সাধারণত হরমোন প্রতিস্থাপনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যা প্রায়শই আজীবন গ্রহণ করতে হয়। থাইরয়েড হরমোন শরীরের থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান, যার অভাব হলে শিশু শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী হতে পারে। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসা করেও আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো আর সম্ভব হয় না।

ডা. শাহজাদা সেলিম জানান, থাইরয়েডের সমস্যা দুই ধরনের হয়। হাইপোথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড হরমোন কম ক্ষরণজনিত সমস্যা ও হাইপারথাইরয়েডিজম অর্থাৎ এই হরমোন বেশি ক্ষরণের সমস্যা। 

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি হাইপোথাইরয়েডিজমই বেশি দেখা যায়। হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত ছোট শিশুদের উচ্চতা ও ওজন ঠিকমতো বাড়ে না, সাধারণত খুব দুর্বল প্রকৃতির হয়ে থাকে, কোষ্ঠকাঠিন্য, ত্বকের সমস্যা দেখা যায়, পেট ফুলে যায়, চেহারায়ও অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। আরেকটু বড় শিশুদের হাইপোথাইরয়েডিজমের সমস্যা হলে বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না, বয়োঃসন্ধি আসতে দেরি হয়। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি হয়ে যাওয়ার পর থাইরয়েড সমস্যা হলে স্থায়ী কোনো ক্ষতি হয় না। হাইপার বা হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত শিশুদের সঠিক চিকিৎসা করা হলে সুস্থ অন্য সবার মতোই শারীরিক, মানসিক বৃদ্ধি অর্জন ও পরিপূর্ণ সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন যাপন সম্ভব। তাই সমস্যা শুরু হওয়ার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসা জরুরি।

ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হরমোন ও ডায়াবেটিক বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মাজহারুল হক তানিম জানান, থাইরয়েড আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই নারী। ৮ শতাংশ রোগী সাব-ক্লিনিক্যাল হাইপোথাইরোডিজমে ভুগছে, যার অধিকাংশই জানে না তারা থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত। এছাড়া দেশে হাইপোথাইরয়েডিজমের বা কম থাইরয়েড একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। 

হাইপোথাইরয়েডিজম হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি যথেষ্ট পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। থাইরয়েড হরমোন শরীরের বিপাক, হৃদস্পন্দন, শারীরিক তাপমাত্রা এবং অন্যান্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ কার্যকলাপকে নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রাইমারি হাইপোথাইরয়েডিজমের কারণগুলো হল:

কোনও ‘অটোইমিউন’ (যেখানে অনাক্রম্যতা শক্তি শরীরকেই আক্রমণ করে) কারণে হতে পারে।

বাচ্চার থাইরয়েড গ্রন্থি ভালো করে তৈরি না হলে স্বাভাবিকভাবেই থাইরয়েডের ক্ষরণ কম হয়।

থাইরয়েডের সংক্রমণ বা কোনও অসুখের কারণে শল্যচিকিৎসা করে বাচ্চার থাইরয়েড গ্রন্থির কিছুটা বাদ দিলেও হাইপোথাইরয়েডিজম হয়।

গর্ভাবস্থায় মা কিছু বিশেষ ধরনের ওষুধ খেলেও বাচ্চার হাইপোথাইরয়েডিজম হয়।

বাচ্চা ‘লিথিয়াম’, ‘অ্যামিয়োডারোন’ জাতীয় ওষুধ খেলেও তার এই সমস্যা হতে পারে।

এছাড়া কোনও কারণে রেডিয়েশন দেওয়া বা জোরে আঘাত লাগলেও সেকেন্ডারি হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে।

দেহের ‘হরমোন রিসেপ্টর সিস্টেম’ ঠিকভাবে কাজ না করলেও বাচ্চার শরীর থাইরয়েড হরমোনের কার্যকারিতার সুফল গ্রহণ করতে পারে না।

পরীক্ষা করানো কাদের দরকার-

উন্নত দেশে সব শিশুকে বাধ্যতামূলকভাবে থাইরয়েড পরীক্ষা করা হয়। কারণ, থাইরয়েডের অভাবজনিত সমস্যার লক্ষণ প্রকাশ পেতে সময় লাগে। আর যখন লক্ষণ দেখা যায়, তত দিনে শিশুর বুদ্ধিমত্তা অনেক কমে যায়। আমাদের দেশে যেখানে সবার পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না, সে ক্ষেত্রে যারা বিশেষ ঝুঁকিতে আছে, তাদের পরীক্ষা করা অতি জরুরি। যেমন- মা যদি কোনো থাইরয়েড সমস্যার ওষুধ খান বা আয়োডিনের অভাব থাকে, পরিবারের কারও জন্মগত থাইরয়েড সমস্যা থাকলে, জন্মের পর নবজাতক দেরিতে কালো পায়খানা করলে, শিশুর জন্ডিস ২ সপ্তাহের বেশি দীর্ঘায়িত হলে, শিশুর ডাউন সিনড্রোম এবং শিশুর মধ্যে থাইরয়েড সমস্যার কোনো উপসর্গ দেখা গেলে।

কখন পরীক্ষা জরুরী-

বিভিন্ন গাইডলাইন অনুযায়ী, জন্মের পরপরই সব শিশুর কর্ড ব্লাড বা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রক্তে টিএসএইচ পরীক্ষা করে স্ক্রিনিং করতে হবে। এ ছাড়া স্বল্প ওজন ও অতি অসুস্থ নবজাতকের ক্ষেত্রে সাত দিনের মাথায় বা কিছুটা সুস্থ হলে পুনরায় পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে।

তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ঝুঁকিতে থাকা নবজাতকের থাইরয়েড সমস্যা নির্ণয়ের জন্য তিন-চার দিনের সময় এফটিফোর ও টিএসএইচ পরীক্ষা করাই উত্তম। এ ছাড়া যেকোনো শিশুর মধ্যে থাইরয়েড সমস্যার কোনো উপসর্গ দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করা বাঞ্ছনীয়। জন্মের পরপরই কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে সহজেই এই রোগ নির্ণয় করা যায় এবং স্বাভাবিক মেধা বিকাশ ও বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করা যায়।

লিভোথাইরক্সিন খাওয়াতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সারা জীবন ওষুধ চালিয়ে যেতে হয়। ওষুধের মাত্রা রোগীভেদে ভিন্ন, তবে প্রাথমিকভাবে ১ মাস বয়স পর্যন্ত প্রতি কেজি ওজনের জন্য ১০-১৫ মাইক্রোগ্রাম হিসেবে শুরু করা যেতে পারে।