বাসস
  ০৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০
আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ২০:৩৮

বাড়ছে লোকবল ও ল্যাব : নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সরকারের বহুমাত্রিক উদ্যোগ

প্রতীকী ছবি

 / একেএম রাশেদ শাহরিয়ার /

ঢাকা, ৯ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। শাক-সবজি, চাল, ডিম, দুধ, মাছ, মাংসসহ সব ধরনের খাদ্যের গুণগত মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে বাড়ানো হচ্ছে জনবল, স্থাপন করা হচ্ছে আধুনিক পরীক্ষাগার (ল্যাব) এবং হালনাগাদ করা হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তার মানদণ্ড। একই সঙ্গে খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি, ঝুঁকি মূল্যায়ন, গবেষণা, জনসচেতনতা এবং আইন প্রয়োগের কার্যক্রমও জোরদার করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) বিভিন্ন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যমান আইনের আওতায় বিভিন্ন সংস্থার নির্ধারিত খাদ্যের গুণগত মান ও নির্দেশিকাকে নিরাপত্তার সর্বোচ্চ মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব খাদ্যের ক্ষেত্রে এখনো কোনো মানদণ্ড নেই, সেগুলোর জন্য নতুন করে মান ও নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে।

খাদ্যে দূষণ, রোগজীবাণু, সার, কীটনাশক ও বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ, পশু ও মৎস্য রোগের ওষুধের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু, ফুড অ্যাডিটিভ, প্রিজারভেটিভ, মাইকোটক্সিন, অ্যান্টিবায়োটিক এবং গ্রোথ প্রোমোটারের সহনীয় মাত্রা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নির্ধারণ বা হালনাগাদ করা হবে। যেসব ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনে কোনো সহনীয় মাত্রা নির্ধারিত নেই, সেখানে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে নতুন মান নির্ধারণ করা হবে।

এছাড়া খাদ্যে তেজস্ক্রিয়তার সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সনদের জন্য অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালা প্রণয়ন এবং খাদ্য পরীক্ষাগারগুলোর আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষাগারগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পরিবীক্ষণের পাশাপাশি কোনো ত্রুটি বা বিচ্যুতি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হবে।

একই সঙ্গে আমদানি করা খাদ্যের মানদণ্ড ও পরীক্ষণ পদ্ধতি নির্ধারণ, মোড়কজাত খাদ্যের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিগুণ-সংক্রান্ত দাবি প্রকাশের নীতিমালা প্রণয়ন, সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত তথ্য বিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাবিষয়ক নীতিমালা ও বিধিমালা প্রণয়ন এবং বিদ্যমান বিধিমালা সংশোধনে সরকারকে বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বিএফএসএ। একই সঙ্গে খাদ্য গ্রহণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি, জৈবিক ঝুঁকি এবং খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি ও বিস্তারের বিষয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা ও বিশ্লেষণের কাজও জোরদার করা হয়েছে।

সরকার, সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের কাছে খাদ্যের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি-সংক্রান্ত ঝুঁকির তথ্য নিয়মিত পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি দেশব্যাপী নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বৈজ্ঞানিক পরামর্শ দেওয়া এবং মাঠপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারে একটি শক্তিশালী কারিগরি সহযোগিতা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজও চলছে।

দেশীয় খাদ্য এবং স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করে আমদানি ও রপ্তানীকৃত খাদ্যের মানে সামঞ্জস্য আনার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি খাদ্য ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন প্রবিধান প্রণয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) সচিব শ্রাবস্তী রায়।

তিনি বাসস’কে বলেন, একটি সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। সরকার নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে আইন প্রণয়ন, নীতিমালা প্রণয়ন এবং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করছে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; উৎপাদক, প্রক্রিয়াজাতকারী, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা-খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ দায়িত্ব পালনে সচেতন ও আন্তরিক হতে হবে।

শ্রাবস্তী রায় বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদিত খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে প্রতিটি মানুষ নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পায়।

তিনি বলেন, এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন খাদ্য বিক্রয়কেন্দ্রে নিয়মিত নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্য ব্যবসায়ী, স্ট্রিট ফুড বিক্রেতা এবং হোটেলকর্মীদের স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাদ্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিবেশন বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

খাদ্যের মান যাচাই ও ভেজাল শনাক্তে দেশের পরীক্ষাগার নেটওয়ার্কের সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা আরও সম্প্রসারণে কাজ চলছে।

বিএফএসএ’র সচিব বলেন, খাদ্যে ভেজাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধে কেবল আইন প্রয়োগ করলেই কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। এর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে নৈতিক ব্যবসায়িক চর্চা গড়ে তোলা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য ও মেধা বিকাশ অনেকাংশে নিরাপদ খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই ভেজালমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক দায়বদ্ধতাও।

ভোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শ্রাবস্তী রায় বলেন, খাদ্য কেনা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা ভেজালের তথ্য পাওয়া গেলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে বাংলাদেশকে শতভাগ নিরাপদ খাদ্যের দেশে পরিণত করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) সদস্য (আইন ও নীতি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, দেশব্যাপী নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করতে বহুমাত্রিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনবল সম্প্রসারণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বাসস’কে বলেন, বর্তমানে দেশের ৪৭টি পরীক্ষাগারের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের গুণগত মান পরীক্ষা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত বাজার তদারকি ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে বিএফএসএ। এ জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে জনবল বৃদ্ধির কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে।

আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নিরাপদ খাদ্য আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে দেশজুড়ে নিয়মিত কর্মশালা, সেমিনার, মেলা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হচ্ছে। পাশাপাশি আধুনিক খাদ্য প্যাকেজিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং তৃণমূল পর্যায়ে দ্রুত খাদ্যের মান যাচাইয়ের জন্য মিনি ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ক্ষতিকর ট্যানারি বর্জ্যের প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে আরও শক্তিশালী করতে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রয়োগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বৈজ্ঞানিক গবেষণা, তথ্য-উপাত্তভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমেই টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

তিনি জানান, নরসিংদী ও গাজীপুরে কিছু শিশুর শরীরে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এর উৎস ও কারণ অনুসন্ধান এবং কার্যকর প্রতিকার নির্ধারণে বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি-এর সঙ্গে যৌথভাবে বিশেষ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে শতভাগ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন, খাদ্য নিরাপত্তার মানদণ্ড হালনাগাদ, গবেষণা জোরদার, আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।