BSS-BNhrch_cat_news-24-5
বাসস
  ১৮ মার্চ ২০২২, ১১:২৯
আপডেট  : ১৮ মার্চ ২০২২, ১৫:১৭

সীমানা পেরিয়ে বর্হিবিশ্বের বাজারেও এখন পঞ্চগড়ের চা

॥ জাকির হোসেন কবির ॥
পঞ্চগড়, ১৮ মার্চ, ২০২২ (বাসস) : দেশের সীমানা পেরিয়ে বর্হিবিশ্বের বাজারেও এখন পঞ্চগড়ের চা। সবুজ চায়ের সমাহার নামে খ্যাত উত্তরের প্রবেশদার জেলা পঞ্চগড়। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের পর চায়ের জেলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এই জেলা। গত দুই দশকে পঞ্চগড়ের সমতল ভূমির চা-শিল্পে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। যেসব উঁচু জমিতে কোনো ফসল হতো না, পতিত অবস্থায় পড়ে থাকত, সেসব জমিতে চা চাষ করে এ জেলার আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে চা-চাষি ও শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্টদের।
তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে পঞ্চগড় সফরে এসে চা চাষের সম্ভাবনার কথা বলেন। অতঃপর ওই সময়ের জেলা প্রশাসক মো. রবিউল হোসেনের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষামূলকভাবে চা চাষ করা হয়। প্রথমে টবে, পরে জমিতে চায়ের চাষ করা হয়। সে সফলতা থেকে পঞ্চগড়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা উৎপাদন করা হয়।
চা চায়ের চাষাবাদ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতোমধ্যে তৃতীয় চা অঞ্চল হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে পঞ্চগড়। পাশাপাশি পঞ্চগড়কে অনুসরণ করে ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও নীলফামারীও ব্যাপক অগ্রসর হচ্ছে চা শিল্পে। তবে পঞ্চগড়ে প্রায় ৪০ হাজার একর জমি চা চাষের উপযুক্ত বলে বলছে বাংলাদেশ চা বোর্ড।
চা চাষ করে স্থানীয় কৃষকরা যেমন ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন, তেমনি এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত চা-শ্রমিকদের জীবনও বদলে গেছে। চায়ের ওপর নির্ভর করছে তাদের জীবন-জীবিকা। পঞ্চগড়ের পাঁচটি উপজেলায় কমবেশি চা-বাগান গড়ে উঠলেও সবচেয়ে বেশি চা-বাগান রয়েছে তেঁতুলিয়া উপজেলায়। সড়কের পাশে বা উঁচু পতিত জমিতে কিংবা পুকুর পাড়ে এমনকি বাড়ির আঙিনায় রয়েছে চায়ের বাগান। আবার কেউ কেউ সুপারি, আম, তেজপাতা বাগানের সাথি ফসল হিসেবে করেছেন চায়ের চাষ।
জেলাজুড়ে গড়ে উঠেছে ছোট বড় হাজারো চা-বাগান। সমতলের চা চাষ বদলে দিয়েছে হাজার কৃষক শ্রমিক ও বেকারের ভাগ্য। চা বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলে চা-বাগান, প্রক্রিয়াকরণ কারখানা ও প্যাকেটজাতকরণ ছোট কারখানাগুলোতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তাদের প্রায় অর্ধেকই নারী। চা-বাগান ও কারখানাগুলোতে কাজ করে এখন অনেকেরই জীবনমানের পরিবর্তন হয়েছে। এদিকে চা-শিল্প থেকে প্রতিবছর সরকারের মোটা অঙ্কের রাজস্ব আদায় হচ্ছে। চা বোর্ডের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে পঞ্চগড় জেলায় ১৬ হাজার একর জমি, চা চাষের উপযোগী রয়েছে। তার মধ্যে জেলায়  ৮ হাজার ৬৪২ একর জমিতে চাষ সম্প্রসারণ হয়েছে। চা চাষ সম্প্রসারণ হওয়ায় বর্তমান জেলায় ১৭টি চা কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব চা কারখানা গত বছরে তৈরি চা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ কোটি কেজি। কিন্তু উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে অতিরিক্ত উৎপাদন হয়েছে প্রায় তিন লাখ কেজি। জেলায় বর্তমানে ৯টি নিবন্ধিত চা বাগান (টি এস্টেট), ১৬টি অনিবন্ধিত চা বাগান, ৯৯৮টি নিবন্ধিত ক্ষুদ্রায়তন চা-বাগান এবং ৫ হাজার ৫০০ অনিবন্ধিত ক্ষুদ্রায়তন চা বাগান রয়েছে।
তেঁতুলিয়া উপজেলার আজিজনগর এলাকার চা-চাষি আলমগীর হোসেন বলেন, আমার উঁচু জমিতে কোনো ফসল না হওয়ায় জমিগুলোতে চা চাষ করে আমি অনেক লাভবান হয়েছি। নতুন করে বাগান লাগিয়েছি চায়ের। পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হাসনুর রশিদ বাবু  জানান, সমতল ভূমির চা দার্জিলিংয়ের চা-কেও হার মানায়। সমতল ভূমিতে চা চাষ করে চাষিরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, বেকার ও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন হচ্ছে। তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহাগ চন্দ্র সাহা জানান, চায়ের বাজার স্থিতিশীল থাকলে পঞ্চগড়ের চা শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইতিমধ্যে চা চাষ করে অনেক মানুষ স্বাবলম্বী হয়েছে। বেকার ও শ্রমিকদেরদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
নর্দান বাংলাদেশ, চা বোর্ড, পঞ্চগড়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন জানান, পঞ্চগড়ের চা বিভিন্ন জেলাসহ বিদেশেও রফতানি হয়ে থাকে। সমতলে চা চাষ করে মানুষ তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। চা-চাষিদের আমরা সব ধরনের সেবা ও পরামর্শ দিয়ে। ইতোমধ্যে পঞ্চগড়ে যেন একটি অকশন বাজার স্থাপন করা হয়, তার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের সমতল ভূমিতে চা চাষ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের পর তৃতীয় বৃহত্তম চা অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে পঞ্চগড়।
চা–বাগানের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথম দিকে টবে, কলেজের মাঠে, পরে পতিত জমিতে চা চাষ করা হয়। সেই সফলতা থেকেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাড়তে থাকে চা চাষের পরিধি। প্রথম দিকে ক্ষুদ্র পর্যায়ে শুরু হলেও ২০০০ সালে তেঁতুলিয়া টি কোম্পানি এবং পরে কাজী অ্যান্ড কাজী টি স্টেটসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানি বাগানপর্যায়ে চা চাষ শুরু করে। এরপর ক্ষুদ্র চাষি পর্যায়েও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে চা চাষের পরিধি। জেলার সমতল ভূমিতে চা চাষ শুরুর পর ২০০৭ সালে ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাট এবং ২০১৪ সালে দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলায় চা চাষ শুরু হয়। ৫টি জেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত ১০টি ও অনিবন্ধিত ১৭টি বড় চা –বাগান (২৫ একরের ওপরে) রয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার ৫১০টি নিবন্ধিত ও ৫ হাজার ৮০০টি অনিবন্ধিত ক্ষুদ্রায়তন চা–বাগানে (২৫ একর পর্যন্ত) রয়েছে। এ পর্যন্ত ১০ হাজার ১৭০ দশমিক ৫৭ একর জমিতে চা চাষ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এমনকি বসতভিটায়ও বিস্তৃত হয়েছে চা চাষ। তবে পঞ্চগড়ে প্রায় ৪০ হাজার একর জমি চা চাষের উপযুক্ত বলে বলছে বাংলাদেশ চা বোর্ড। চা চাষ সম্প্রসারণ ও চা–শিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০১ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি উপকেন্দ্র পঞ্চগড়ে স্থাপিত হয়। পরবর্তীকালে যা বাংলাদেশ চা বোর্ড আঞ্চলিক কার্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
চা বোর্ড আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলে চা চাষের ওপর ভিত্তি করে এ পর্যন্ত ৩৩টি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা অনুমোদন নিয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চগড় জেলায় ১৭টি ও ঠাকুরগাঁও জেলায় ১টি কারখানা চালু রয়েছে। এই কারখানাগুলো চাষিদের কাছ থেকে সবুজ পাতা কিনে তা থেকে চা তৈরি করে। এই চা নিলাম বাজারে বিক্রি করেন চা প্রক্রিয়াকরণ কারখানার মালিকেরা। গত মৌসুমে একেকটি কারখানা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ কেজি পর্যন্ত তৈরি চা উৎপাদন করেছে।
২০১৮ সালে উত্তরাঞ্চলে সবুজ চা পাতা উৎপাদন করা হয়েছে ৪ কোটি ১৬ লাখ ২৮ হাজার ৯৮১ কেজি এবং তা থেকে তৈরি চা উৎপাদিত হয়েছে ৮৪ লাখ ৬৭ হাজার কেজি। ২০২০ সালে সবুজ চা–পাতা (কাঁচা) উৎপাদিত হয়েছে ৫ কোটি ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৩৮৬ কেজি এবং তা থেকে তৈরি চা উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ কেজি। গত মৌসুমে তৈরি চায়ের জাতীয় উৎপাদন হয়েছে ৮৬ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন কেজি। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের ৫টি জেলা—পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাটের সমতল ভূমিতেই উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ কেজি, অর্থাৎ ১০ দশমিক ৩০ মিলিয়ন কেজি; যা গত মৌসুমের চেয়ে ৭ দশমিক ১১ লাখ কেজি বেশি। এবার জাতীয় উৎপাদনের ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ চা যুক্ত হয়েছে উত্তরাঞ্চলের সমতল ভূমি থেকে।
উত্তরাঞ্চলের চা– শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মানুষের কর্মসংস্থান। চা বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী উত্তরাঞ্চলে চা–বাগান, প্রক্রিয়াকরণ কারখানা ও প্যাকেটজাতকরণ ছোট ছোট কারখানাগুলোতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের প্রায় অর্ধেকই নারী। চা– বাগান ও কারখানাগুলোতে কাজ পেয়ে এখন অনেকেরই জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন হয়েছে। চা–শিল্প থেকে প্রতিবছর সরকারের মোটা অঙ্কের রাজস্ব আদায় হচ্ছে। ২০১৯ সালে উত্তরাঞ্চলে ৯৬ লাখ কেজি তৈরি চা উৎপাদিত হয়েছিল। ওই সময় তৈরি চায়ের দাম বেশি থাকায় উৎপাদিত তৈরি চা বিক্রি হয়েছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকায়, যা থেকে সরকারের ১৫ শতাংশ হারে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৩০ কেটি টাকা। এরপর ২০২০ সালে এক কোটি তিন লাখ কেজি তৈরি চা উৎপাদিত হয়েছিল, যা বিক্রি হয়েছে প্রায় ১৫৬ কোটি টাকায়, যা থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ২৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
এ এলাকার চা চাষের বিশেষত্ব হচ্ছে কৃষকরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চা বাগান গড়ে তুলছে। যা প্রান্তিক চাষিদের ভাগ্যোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জেলায় চা চাষ হওয়ায় চাষিদের ৯ মাসের আয়ের পথ তৈরি হয়েছে। হয়েছে স্থানীয় বেকার যুবদের কর্মসংস্থান। জমির দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। বাগানগুলোকে কেন্দ্র করে আশপাশে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া চা বাগান দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে পর্যটক। এতে জেলার চিত্র গত কয়েক বছর আগের তুলনায় পাল্টে গেছে কয়েক গুণ। বেড়েছে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ। সরকারি কোষাগারে যোগ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থের
বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ শামীম আল মামুন বলেন, ‘সমতল ভূমিতে চা চাষের জন্য পঞ্চগড় ও এর পার্শ^বর্তী জেলাগুলো অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এলাকা। চায়ের চাষ সম্প্রসারণের জন্য আমরা চাষিদের বিভিন্ন সহায়তার মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করছি। এ এলাকায় চায়ের নিলাম বাজার স্থাপনে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।
একসময়ের পতিত গো-চারণ ভূমি ও দেশের সবচেয়ে অনুন্নত জেলা এখন চায়ের সবুজ পাতায় ভরে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে চোখ জুড়ানো নৈসর্গিক সৌন্দর্য। দেশের বাজারসহ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে পঞ্চগড়ের চা। এখানকার অর্গানিক চা বিক্রি হচ্ছে লন্ডনের হ্যারোড অকশন মার্কেটে। রপ্তানি হচ্ছে দুবাই, জাপান ও আমেরিকায়। চা বোর্ডের 'স্ট্র্যাটেজিক ডেভেলপমেন্ট পান ফর টি ইন্ডাস্ট্রি অব বাংলাদেশ ভিশন-২০২১' প্রকল্প গ্রহণ করায় এখানকার চাষিদের মধ্যে চা উৎপাদনের আগ্রহ বেড়ে গেছে। তেঁতুলিয়া থেকে দার্জিলিংয়ের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। আর এখানে উৎপাদন হচ্ছে পৃথিবীর সেরা চা।
আগে যেখানে পুরুষ শ্রমিকরা পাথর উত্তোলন আর নারী শ্রমিকরা পাথর ভেঙে জীবিকা নির্বাহ করত। এখন নারীদের কোমল হাত দিয়ে তোলা হচ্ছে দুইটি পাতা একটি কুঁড়ি। বিশেষ করে দরিদ্র ও বঞ্চিত নারীদের জীবনে দুই বেলা দুই মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা দিয়েছে

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়