বাসস
  ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৭

যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ঘোষণা কানাডার

ঢাকা, ২৬ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। মঙ্গলবারের এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য বিরোধ আরও তীব্র হলো।

কানাডার নতুন শুল্ক আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নতুন শুল্কের জবাব কানাডা ওই সময়ের মধ্যে দেবে।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কানাডা ১৫, ২৫ ও ৫০ শতাংশ হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে। এর আওতায় পড়বে ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্য।

পাল্টা শুল্কের তালিকায় রয়েছে তাজা ও হিমায়িত মাছ, ডিশওয়াশার ও ওয়াশিং মেশিনের মতো ভোগ্যপণ্য এবং রেলপথ নির্মাণে ব্যবহৃত বিভিন্ন শিল্পপণ্য।

একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিকদের সহায়তায় ৫৪০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ৭৫০ কোটি কানাডীয় ডলারের একটি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে কানাডা।

অর্থমন্ত্রী শ্যাম্পেন বলেন, কানাডার ওপর এমন পরিস্থিতি আগে কখনো আসেনি। তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কানাডা প্রস্তুত এবং দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ।

কানাডার শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমর্থন করার জন্য নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নতুন মিত্র ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করার কথা জানান তিনি।

ট্রাম্প কানাডার গাড়ির ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করলে কানাডা তার জবাব দেবে বলেও সতর্ক করেন জোলি।

পাল্টাপাল্টি শুল্ক: উত্তেজনা কি আরও বাড়বে?

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ শুল্ক কানাডা থেকে আমদানি করা প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের পণ্যে প্রযোজ্য হয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বাণিজ্য আলোচনা শেষ মুহূর্তে ভেঙে যাওয়ার পর এসব শুল্ক আরোপ করে ওয়াশিংটন।

কানাডার পাল্টা পদক্ষেপের আওতায় আগে থেকেই ২৫ শতাংশ শুল্কের মুখে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যে শুল্ক বেড়ে ৫০ শতাংশ হবে।

এ ছাড়া গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, পনিরসহ বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য এবং কিছু ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক বসবে।

ইলেকট্রিক সরঞ্জাম ও বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির মতো কিছু পণ্যে আরোপ করা হবে ১৫ শতাংশ শুল্ক।

২০২৪ সালের হিসাবে এসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডার মোট আমদানির প্রায় ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

তবে বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, এক দেশের শুল্কের জবাবে অন্য দেশের পাল্টা শুল্ক আরোপের এই প্রক্রিয়া আরও বড় বাণিজ্যযুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

সোমবার ট্রাম্পও ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২৭ সাল থেকে কানাডার গাড়ির ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করা হতে পারে। বর্তমানে গাড়িতে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে উৎপাদিত উপাদানের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে।

ট্রাম্পের এই হুমকির কঠোর সমালোচনা করেছেন কানাডার অন্টারিও প্রদেশের প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড। এমনকি তিনি ট্রাম্পকে কড়া ভাষায় জবাব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত মাশুল আরোপের হুমকি দিয়েছেন।

ট্রাম্পও ফোর্ডের সমালোচনা করেন এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নিকে ‘গভর্নর’ বলে উল্লেখ করেন। এর মাধ্যমে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়ে তাঁর আগের বিতর্কিত বক্তব্যও আবার সামনে আসে।

মঙ্গলবার ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।

কানাডার অর্থনীতিতে প্রভাবের আশঙ্কা

নতুন মার্কিন শুল্কের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতাভুক্ত পণ্যগুলোর জন্যও কোনো ছাড় রাখা হয়নি।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে কানাডার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ওপর কার্যকর গড় শুল্কের হার ৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াবে।

প্লাস্টিক, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং কাঠ ও কাগজজাত পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধিই এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকস বলেছে, কানাডার কুইবেক, নিউ ব্রান্সউইক ও অন্টারিও প্রদেশের উৎপাদন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কানাডার সংস্কৃতি ও ভাষা নিয়ে উদ্বেগ

দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

২৫ বছর বয়সী স্টার্টআপ উদ্যোক্তা ইথান জনসন এএফপিকে বলেন, ‘এর পেছনের অর্থনৈতিক যুক্তি ও হিসাব কোনোভাবেই মেলে না।’

তবে ২৯ বছর বয়সী ইলেকট্রিশিয়ান লুকাস ফিজার মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ‘আরও কঠোর ও ভালো একটি চুক্তি করতে সক্ষম হবে।’

কার্নি এর আগে জানিয়েছিলেন, বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার আগে মার্কিন আলোচকেরা অন্যান্য দেশের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য চুক্তির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি তুলেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা কানাডার ফরাসিভাষী পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ কুইবেকের ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়েও অগ্রহণযোগ্য ‘হুমকি’ দিয়েছিলেন।

ট্রাম্প মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 

মঙ্গলবার ট্রাম্প এ বিষয়ে তার  জবাব দিয়ে  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে বলেন, তিনি কখনোই কানাডীয়দের ফরাসি ভাষায় কথা বলায় হস্তক্ষেপ করবেন না। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার জন্য কার্নি মিথ্যা বলছেন বলে অভিযোগ করেন।’

যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে যায়।

চলতি বছর পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মেক্সিকোর পর কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।

রোববার প্রকাশিত অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ কানাডীয় বাণিজ্য আলোচনা থেকে সরে আসার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্নির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন। তবে অনেকেই এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।

অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের অভিযোগ—নতুন শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালকোহল, গাড়ি ও দুগ্ধজাত পণ্যের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে।