শিরোনাম

ঢাকা, ১০ জুন, ২০২৬ (বাসস) : দেশে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও সহজ, সাশ্রয়ী ও সর্বজনীন করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের চালু করা বাংলা কিউআর এখন নগদবিহীন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের এক সার্কুলার অনুযায়ী, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে দেশের সব ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব কিউআর কোডের পরিবর্তে বাংলা কিউআর চালু বা এর সঙ্গে সংযুক্ত হতে হবে।
আগামী ১ জুলাই থেকে সারাদেশে বাংলা কিউআর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে। এর ফলে শপিং মল থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র দোকান ও ফুটপাতের ব্যবসায়ী পর্যন্ত সর্বত্র একটি অভিন্ন কিউআর কোড ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে।
আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি ডিপার্টমেন্টের পরিচালক শাহারিয়ার সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলা কিউআর শুধু একটি পেমেন্ট প্রযুক্তি নয়, এটি দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
বিবৃতিতে আরোও বলা হয়, একবিংশ শতাব্দীতে আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। একসময় নগদ অর্থ ও কাগুজে নোট ছিল লেনদেনের প্রধান মাধ্যম। বর্তমানে স্মার্টফোনভিত্তিক ডিজিটাল পেমেন্ট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলা কিউআর।
এতে আরও বলা হয়, চীন, ভারত ও ব্রাজিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা খুচরা লেনদেনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
বাংলাদেশেও বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংক নিজস্ব কিউআর কোড চালু করেছিল। তবে এসব কিউআর কোড পরস্পরের সঙ্গে সমন্বিত না হওয়ায় গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই বাংলাদেশ ব্যাংক জাতীয় ও আন্তঃকার্যকর পেমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে বাংলা কিউআর চালু করেছে।
এর ফলে একজন ব্যবসায়ীর দোকানে একটি বাংলা কিউআর থাকলেই গ্রাহক বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা যেকোনো ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে সহজেই অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় শক্তি এর সর্বজনীনতা ও কম খরচ। প্রচলিত কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট গ্রহণে যেখানে ব্যয়বহুল পয়েন্ট অব সেল (সিএম) মেশিনের প্রয়োজন হয়, সেখানে বাংলা কিউআর ব্যবহারে একটি সাধারণ কিউআর স্টিকারই যথেষ্ট। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পথের দোকানদার কিংবা বিভিন্ন সেবাদাতাও সহজে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারবেন।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বাংলা কিউআর একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা। এতে কার্ড ক্লোনিং বা পিন চুরির মতো ঝুঁকি নেই। গ্রাহকের ব্যাংক বা মোবাইল ওয়ালেট অ্যাপ থেকেই সরাসরি লেনদেন সম্পন্ন হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর নির্ভরশীল। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে কম খরচের, দেশীয় এবং কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন ছিল। বাংলা কিউআর সেই প্রয়োজন পূরণ করছে। পাশাপাশি দেশীয় পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহারের কারণে লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য দেশের মধ্যেই সংরক্ষিত থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক গেটওয়ের ওপর নির্ভরতা কমে এবং বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ও হ্রাস পায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও বেশি ক্যাশলেস করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। বর্তমানে দেশের প্রায় সব ব্যাংক, এমএফএস, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) এবং পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর (পিএসও) বাংলা কিউআরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলা কিউআরের মাধ্যমে পরিচালিত লেনদেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য একটি ডিজিটাল আর্থিক পরিচিতি তৈরি করবে। এর ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো ভবিষ্যতে জামানতবিহীন ঋণ প্রদানে আরও উৎসাহিত হতে পারে। একই সঙ্গে নগদ অর্থ ছাপানো, পরিবহন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের যে বিপুল ব্যয় হয়, ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যয়ও কমে আসবে। আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়ায় দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।