বাসস
  ০৪ জুন ২০২৬, ২০:১৭

বিএসইসির সংস্কার কর্মসূচিতে স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাইজেশন ও আস্থা পুনর্গঠনের অঙ্গীকার নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের

বিএসইসি নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান। ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ৪ জুন, ২০২৬ (বাসস): বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, দেশের পুঁজিবাজারকে খুচরা বিনিয়োগকারী-নির্ভর সীমান্ত বাজার থেকে একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ-নির্ভর বাজারে রূপান্তর করাই নতুন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য।

আজ বৃহস্পতিবার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএসইসিতে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুঁজিবাজার নিয়ে নিজেদের ভাবনা, লক্ষ্য ও নতুন কমিশনের নীতিমালার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছে সংস্থাটির নতুন কমিশন। এ সময় বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান মো. মাসুদ খান এ সব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে তিন কমিশনার নাফিজ আল তারিক, নাহিদ মাহতাব ও তানভীর হাবিব রহমান ছাড়াও বিএসইসির নির্বাহী পরিচালকসহ দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 

মাসুদ খান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত ও শক্তিশালী হলেও পুঁজিবাজার সেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হয়েছে, ভালো মানের কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগও কমেছে।

তিনি বলেন, নতুন কমিশনের ভিশন হচ্ছে এমন একটি পুঁজিবাজার গড়ে তোলা, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মূলধন সংগ্রহে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, কমিশন বিদ্যমান বিধিবিধান, রিপোর্টিং প্রয়োজনীয়তা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমাবে এবং ধীরে ধীরে নীতিনির্ভর ও ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদ-ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক প্রতিবেদন ও তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতাও পুনর্বিবেচনা করা হবে।

ডিজিটাইজেশনকে সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইপিও আবেদন, রাইটস ইস্যু, বন্ড ও সুকুক অনুমোদন, লাইসেন্সিং এবং নিয়ন্ত্রক দাখিলপত্র ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করা হবে। এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও দক্ষ হবে।

পুঁজিবাজারে ভালো মানের সিকিউরিটিজের সরবরাহ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে চেয়ারম্যান বলেন, বহুজাতিক কোম্পানি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং বৃহৎ স্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি উপযুক্ত কোম্পানির জন্য স্বচ্ছ ও কার্যকর ডাইরেক্ট লিস্টিং কাঠামো প্রবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।

তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর ও প্রশাসনিক সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে সমন্বিতভাবে ‘লিস্টেড কোম্পানি অ্যাডভান্টেজ প্রোগ্রাম’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে তালিকাভুক্ত হওয়া করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

াসুদ খান বলেন, পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সরবরাহ নিশ্চিত করতে মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন তহবিল, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং বীমা কোম্পানির মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ জোরদার করা হবে। মিউচুয়াল ফান্ড খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, তথ্য প্রকাশের মান উন্নয়ন, বাজারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।

বাজার তদারকি ও আইন প্রয়োগে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, কমিশন, ডিএসই, সিএসই ও সিডিবিএলের সমন্বয়ে আধুনিক নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলা হবে। ইনসাইডার ট্রেডিং, সার্কুলার ট্রেডিং, ওয়াশ ট্রেড, পাম্প অ্যান্ড ডাম্প স্কিম, ফ্রন্ট রানিংসহ বিভিন্ন ধরনের বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, কমিশনের লক্ষ্য বাজারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং ন্যায্য মূল্য আবিষ্কার এবং তথ্যের সমান প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। সৎ বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই, তবে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিনিয়োগকারী সুরক্ষাকে নিয়ন্ত্রক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তথ্য প্রকাশের মান উন্নয়ন, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং বিনিয়োগকারী শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও খুচরা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে ফ্লোর প্রাইস কোনো স্থায়ী বাজারব্যবস্থা হতে পারে না। তাই ভবিষ্যতে নতুন করে কোনো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না এবং বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে।

মাসুদ খান বলেন, নতুন কমিশনের সাফল্য ঘোষণা দিয়ে নয়, বরং বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে মূল্যায়িত হবে। বিনিয়োগকারী, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, বাজার মধ্যস্থতাকারী, স্টক এক্সচেঞ্জ ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ বজায় রেখে একটি ন্যায়সঙ্গত, বিশ্বাসযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পুঁজিবাজার গড়ে তোলাই কমিশনের লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বিশ্বাস গড়ে তোলা। কারণ বিশ্বাস ছাড়া আস্থা সৃষ্টি হয় না, আস্থা ছাড়া বিনিয়োগ আসে না, আর বিনিয়োগ ছাড়া একটি টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে উঠতে পারে না।’