শিরোনাম

ঢাকা, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস ও বৈদেশিক খাতের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এখনও চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।
জিইডির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। মূলত খাদ্যদ্রব্যের মূল্য হ্রাসই এর প্রধান কারণ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বৃদ্ধি এবং বোরো ধান বাজারে আসায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সময় চালের মূল্যস্ফীতি মাইনাস হয়ে ২ দশমিক ২০ শতাংশে নেমে আসে।
তবে আবাসন, পরিবহন ও ইউটিলিটি খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অখাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থানে থেকে ৯ দশমিক ০৯ শতাংশে রয়েছে। বিনিময় হারজনিত প্রভাব ও জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতিই এর প্রধান কারণ।
মার্চ মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার বেড়ে ৮.০৯ শতাংশে পৌঁছালেও, জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় তা এখনও পিছিয়ে থাকায় প্রকৃত আয় চাপের মুখে রয়েছে।
তবে অখাদ্য মুদ্রাস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে-৯.০৯ শতাংশ। বাসস্থান, পরিবহন ও ইউটিলিটি খাতে স্থায়ী ব্যয় চাপ-এর মূল কারণ, যা মূলত বিনিময় হার, প্রভাব ও জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে হয়েছে।
মার্চে মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির ব্যবধান কিছুটা কমে এলেও, মজুরি বৃদ্ধি ৮ দশমিক ০৯ শতাংশে পৌঁছালেও তা এখনও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলাতে পারছে না, ফলে প্রকৃত আয় চাপে রয়েছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক অস্থিরতার বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হিসেবে কাজ করছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহও শক্তিশালী ছিল-মার্চে ৩.৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এসেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও প্রবাসী আয়কে স্থিতিশীল রেখেছে।
বিনিময় হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল-প্রতি মার্কিন ডলারে ১২২.৬২ টাকা। তবে প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বৈশ্বিক চাহিদার দুর্বলতা ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মার্চে বছরওয়ারি ভিত্তিতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা মন্থর হয়েছে।
আর্থিক খাতের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ফেব্রুয়ারিতে ২৯ দশমিক ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা মূলত জ্বালানি সংশ্লিষ্ট ব্যয় মেটাতে সরকারের ঋণ গ্রহণের কারণে হয়েছে।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬.০৩ শতাংশ, যা বিনিয়োগে সতর্ক মনোভাবের ইঙ্গিত বহন করে।
রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় আর্থিক চাপ স্পষ্ট রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মার্চ মাসে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬২ দশমিক ৯০ শতাংশ অর্জন করতে পেরেছে, বিশেষ করে ভ্যাট ও আয়করে ঘাটতির কারণে।
একই সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন মন্থর হয়েছে। জুলাই-মার্চ সময়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা, যা কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও কঠোর রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শক্তিশালী রেমট্যান্স প্রবাহ ও পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে। তবে উদীয়মান ঝুঁকি মোকাবেলায় সতর্ক ও বিচক্ষণ নীতি গ্রহণ প্রয়োজন।
বিশেষ করে, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মূল্যস্ফীতির সাম্প্রতিক হ্রাস প্রবণতাকে উল্টে দিতে পারে এবং বৈদেশিক ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
স্থিতিশীল অর্থনীতি নিশ্চিত করতে প্রতিবেদনে রাজস্ব আহরণ জোরদার করা ও সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।