শিরোনাম

ঢাকা, ২ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : নতুন শিল্পের বিকাশ ও সুরক্ষায় আগামী বাজেটে দেশে উৎপাদিত কালার কসমেটিকস ও ডার্মাস্কিন কেয়ার পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক অব্যাহতির দাবি জানানো হয়েছে। এ খাতের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব স্কিন কেয়ার অ্যান্ড বিউটি প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অব বাংলাদেশ (এএসবিএমইবি) এ দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনটি মনে করে, এ ধরনের নীতিসহায়তা নিশ্চিত করা হলে দেশীয় শিল্পের বিকাশ, ন্যায্য বাজার প্রতিযোগিতা এবং ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ব্যক্তিগত সুরক্ষা পণ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশে বিশ্বমানের কালার কসমেটিকস পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে উদ্যোক্তাদের নতুন শিল্প স্থাপন ও সম্প্রসারণে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সম্ভাবনাময় এই খাত ইতোমধ্যে নতুন রপ্তানি খাত হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, দেশে উৎপাদিত কালার কসমেটিকস, ডার্মাস্কিন কেয়ার পণ্য এবং এসব পণ্যের প্যাকেজিং তৈরিতে ব্যবহৃত মৌলিক কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক মূল্যভিত্তিক ১ শতাংশের বেশি হলে অতিরিক্ত অংশসহ আরোপিত রেগুলেটরি ডিউটি ও সম্পূরক শুল্ক থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং দেশীয় শিল্প প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে আসবে।
এছাড়া সাবান উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল ‘সোপ নুডুলস’-এর ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক হ্রাস এবং রেগুলেটরি ডিউটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। বর্তমানে কাস্টমস ট্যারিফ শিডিউল ২০২৫-২৬ অনুযায়ী সোপ নুডুলসের ওপর ২৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি এবং ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি আরোপিত রয়েছে। এর ফলে দেশীয় উৎপাদকদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং তারা বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সোপ নুডুলস তৈরির কাঁচামাল— আরবিডি পাম স্টিয়ারিন ও অপরিশোধিত পাম কার্নেল তেল কম শুল্কে আমদানি করে নিজস্বভাবে উৎপাদন করতে পারছে। এসব কাঁচামালের ওপর কাস্টমস ডিউটি মাত্র ১০ শতাংশ এবং রেগুলেটরি ডিউটি শূন্য। ফলে তারা তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন করে বাজারে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
এই বৈষম্যমূলক শুল্ক কাঠামোর কারণে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি সোপ নুডুলস আমদানি করে সাবান উৎপাদনে বেশি ব্যয় বহন করছে। ফলে তারা সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হচ্ছে, আর বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বেশি মুনাফা অর্জন করছে। এমনকি দেশীয় উৎপাদকদের কাছে সোপ নুডুলস বিক্রিতেও অনীহা দেখাচ্ছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো।
সংগঠনের সভাপতি আশরাফুল আম্বিয়া বলেন, প্রসাধনী শিল্প অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। দেশে ইতোমধ্যে মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন শুরু হয়েছে, যা আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে ডলার সাশ্রয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি এটি রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বিদ্যমান অতিরিক্ত ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, আমদানিকৃত পণ্যের ট্যারিফ ভ্যালু কম নির্ধারণ করায় বাজারে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্রয়মূল্য গোপন রেখে কম ট্যারিফে শুল্কায়ন করা হয়, ফলে আমদানিকৃত পণ্যের ল্যান্ডেড কস্ট দেশীয় উৎপাদনের তুলনায় কম পড়ে। এতে সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ট্যারিফ মূল্য নির্ধারণ এবং নেট ওজনের পরিবর্তে গ্রস ওজন বিবেচনায় শুল্কায়নের দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে ২০ থেকে ৩৯ বছর বয়সী নারীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৭৩ লাখ, যার প্রায় ৭০ শতাংশ প্রসাধনী পণ্যের ব্যবহারকারী। এতে বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার কালার কসমেটিকস এবং ২৫ হাজার কোটি টাকার ত্বকচর্চা পণ্যের বাজার তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে প্রসাধনী পণ্যের বাজার ছিল ১২৩ কোটি মার্কিন ডলার, যা ২০২৭ সালের মধ্যে ২১২ কোটি ডলারে উন্নীত হতে পারে।
প্রসাধনী আমদানিকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার প্রসাধনী আমদানি হয়। একইসঙ্গে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার বাজার কালোবাজারিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, নিম্নমানের বিদেশি পণ্য আমদানির ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। তাই দেশীয় উৎপাদকদের নীতিসহায়তা প্রদান এবং নিম্নমানের পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এতে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং অর্থপাচার কমবে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দীন বলেন, কসমেটিকস বাজারে চোরাই ও নকল পণ্যের প্রবেশ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য আমদানি কিংবা স্থানীয়ভাবে নকল পণ্য উৎপাদনের কারণে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে এবং ভোক্তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।
তিনি আরো বলেন, কাঁচামালে উচ্চ শুল্ক এবং তৈরি পণ্যে তুলনামূলক কম শুল্ক থাকার কারণে দেশীয় উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। তবে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে উৎপাদিত আন্তর্জাতিক মানের কসমেটিকস পণ্য মধ্যপ্রাচ্য, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। সঠিক নীতিসহায়তা পেলে এই খাত দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।