শিরোনাম

ঢাকা, ৩০ মার্চ, ২০২৬ (বাসস): জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশ দ্রুতই ‘উচ্চ সম্ভাবনাময় প্রবৃদ্ধির দিগন্ত’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এখানে জাপানি কোম্পানিগুলোর মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং স্থানীয় বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণে তারা জোরালো প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) ঢাকা অফিসের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজুইকি কাতাওকা ২০২৫ অর্থবছরের বিদেশে পরিচালিত জাপানি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিষয়ক জরিপের ফলাফল উপস্থাপনকালে জানান, বাংলাদেশে অবস্থানরত ৫৬.৯ শতাংশ জাপানি কোম্পানি আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
তিনি বলেন, ‘এই সম্প্রসারণের প্রবণতা ভিয়েতনামের সমপর্যায়ের এবং এর প্রধান কারণ স্থানীয় বাজারের চাহিদা বৃদ্ধি, যা ৬৬.৭ শতাংশ কোম্পানি উল্লেখ করেছে।’
‘জাপান বিজনেস ডে’ উপলক্ষ্যে আজ রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন।
বাংলাদেশে জাপান দূতাবাস এবং জেট্রো ঢাকা অফিসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
কাজুইকি কাতাওকা বলেন, দেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য ঊর্ধ্বমুখী। জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে কার্যরত ৫০% জাপানি কোম্পানি পরিচালন মুনাফার পূর্বাভাস দিয়েছে, যা ২০২৪ সালের ৪১.৯% থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
তিনি জানান, অ-উৎপাদন খাতে সম্প্রসারণের আগ্রহ বেশি। এ খাতের ৬২.২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণে আগ্রহী, যেখানে উৎপাদন খাতে এ হার ৪৭.৬ শতাংশ।
তিনি বাংলাদেশের বিশাল বাজার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেন, ১৮ কোটির বেশি জনসংখ্যা এবং গত এক দশকে ৫-৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি এ সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করেছে।
কাতাওকা বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বে ৯ম বৃহত্তম ভোক্তা বাজারে পরিণত হবে এবং যুক্তরাজ্যকে ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, মাথাপিছু আয় ৩ হাজার মার্কিন ডলারের কাছাকাছি (২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৭৬৯ ডলার) পৌঁছানোয় জাপানি ব্র্যান্ডগুলো সরাসরি স্থানীয় ভোক্তাদের সেবা দিতে আগ্রহী হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে, বিশেষ করে ভোক্তামুখী খাতে তাদের উপস্থিতি বাড়ছে।
সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে-এফএমসিজি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল এবং স্বাস্থ্যসেবা।
তিনি উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে লায়ন করপোরেশন, আজিনোমোটো, কিউপি, কিকোম্যান, মিতসুবিশি (র্যানকন), হোন্ডা এবং শিপ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের মতো জাপানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রধান সুবিধাগুলো হলো-স্বল্প শ্রম ব্যয়, বৃহৎ বাজার, প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কম ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা।
তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার ডিউ ডিলিজেন্স (এইচআরডিডি) বাস্তবায়নে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে, যেখানে ৪০.৭ শতাংশ কোম্পানি ইতোমধ্যে এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সকালের অধিবেশনে ‘বাংলাদেশের সঙ্গে ইপিএ চুক্তি স্মারক’ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগের প্রধান ইউতারো মোচিদা।
এরপর জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মহাপরিচালক (রাষ্ট্রদূত) ইজুরু কোবায়াশি অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন।
এছাড়া আরও বক্তব্য রাখেন জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) সভাপতি তারেক রাফি ভূঁইয়া এবং বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত শিনিচি সাইদা।
তারেক রাফি ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশ ও জাপান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। যেখানে উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে সরে এসে একটি পূর্ণাঙ্গ, নীতিনির্ভর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) দেশের জন্য একটি কৌশলগত অগ্রগতি, যা এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
তিনি আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের ফলে বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা, যেমন জিএসপি সুবিধা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাবে। তাই এ প্রেক্ষাপটে ইপিএ একটি কাঠামোবদ্ধ প্রবৃদ্ধির পথ তৈরি করবে।
বিকেলে ‘জেট্রো ২০২৫ জরিপের ভিত্তিতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ’ শীর্ষক সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে কাজুইকি কাতাওকা ‘এশিয়া ও ওশেনিয়ায় জাপানি কোম্পানির ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ২০২৫’ শীর্ষক উপস্থাপনা তুলে ধরেন।
এরপর ‘বাংলাদেশের ভোক্তা বাজারে জাপানের সাম্প্রতিক আগ্রহ’ বিষয়ে উপস্থাপনা দেন জেট্রো ঢাকার প্রতিনিধি তোমোতাকা মিনোউরা এবং সিনিয়র ডিরেক্টর শরিফুল আলম।
তারেক রাফি ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেওয়া সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন, বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রোচি, শু-কু-কাই প্রেসিডেন্ট মানাবু সুগাওয়ারা, মিতসুবিশি কর্পোরেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ হিরোশি উয়েগাকি, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রেজা।