BSS-BNhrch_cat_news-24-5
বাসস
  ২৯ জানুয়ারি ২০২২, ১২:২৯

ভোলায় অনলাইনে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা প্রসার পাচ্ছে

॥ হাসনাইন আহমেদ মুন্না ॥
ভোলা, ২৯ জানুয়ারি, ২০২২ (বাসস) : জেলায় অনলাইন ভিত্তিক নারী উদ্যেক্তাদের বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা প্রসার পাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে পোশাক, বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য, কসমেটিক্স, জুয়েলারী, অর্নামেন্টসসহ নানান পণ্যের ব্যবসা জনপ্রিয়তা পেয়েছে এখানে। অনেক নারীই আগ্রহী হয়ে উঠছেন ডিজিটাল এ প্লাটফর্মে যুক্ত হয়ে ব্যবসা পরিচালনার জন্য। এতে ঘরে বসেই পরিবারের কাজের পাশাপাশি বাড়তি উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছেন নারীরা। অল্প পুঁিজতে নারীরা অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের সফলভাবে প্রকাশ করছেন সমাজে। মাসে কেউ কেউ লাখ টাকা বা তারচেয়ে বেশি আয় করছেন। জেলায় প্রায় দুই শতাধিক নারী উদ্যোক্তা এমনিভাবে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছেন। দিন দিন এদের সংখ্যা বাড়ছে।
স্থানীয়ভাবে মূলত অনলাইনে মানুষের খাদ্য পণ্য ও পোশাকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। অনলাইনে অর্ডারের পর নির্ধারিত সময়ে ক্রেতার পছন্দনীয় পণ্য দরজায় পৌঁছে যায় বিশ^স্ততায়। প্রথম দিকে এ ব্যবসায় পুরুষের সাথে নারীদের অংশগ্রহণ ছিলো সীমিত । গত দুই বছরে এ কার্যক্রমে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ বেড়েছে। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে অনেক নারীই ঘরে বসে এ কার্যক্রম শুরু করেন। যা পরবর্তীতে কেউ কেউ চালিয়ে যাচ্ছেন। যেসব নারীরা কিছু একটা করতে চায় অনলাইন প্লাটফর্ম তাদের জন্য দারুণ একটা সুযোগ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের কালীনাথ রায় বাজার এলাকার নারী নাহিদ নুসরাত তিশা একজন সফল উদ্যেক্তা হিসেবে জেলা ও জেলার বাইরে বেশ পরিচিত রয়েছে। তিশা বাসস’কে জানান, প্রায় ৬ বছর যাবত তিনি অনালাইনে ব্যবসার সাথে জড়িত। পার্লার ও অনলাইনে বুটিক্সসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যের ব্যবসা করেন। কিন্তু করোনার কারণে পার্লাার বন্ধ করে দেন। এখন অনলাইনের মাধ্যমে বাংলা, চাইনিজ, ফাস্টফুড, ডেজার্ট খাবারসহ নানান খাবার আইটেম’র ব্যবসা করছেন। খাবারের পণ্যের জন্য রসুই ঘর ও টি-টুয়েন্টি ফুড নামের দুটি পেইজ রয়েছে অনলাইনে।   
তিনি জানান, খাবারের পাশাপাশি নারীদের থ্রীপিস, শাড়ি, কিটস আইটেম, ছেলেদের পোশাক, বডি¯্র,ে ক্রীম, বিউিটি প্রোডাক্টসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যই বিক্রি হয় তার এখানে। এছাড়া মৌসম ভিত্তিক বিভিন্ন ফলও অনলাইনে বিক্রি করেন তিনি। এসবের জন্য টিরান ব্রান্ড নামক পেইজ খোলা হয়েছে। বর্তমানে বেশ সাড়া পাচ্ছেন এ উদ্যোক্তা। এখানে প্রায় ২০ জন মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। অনলাইনে অর্ডারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় পণ্য পাঠান তিনি। এছাড়া বড় ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে খাবার সরবরাহ করছেন নিয়মিত। 
নারী উদ্যোক্তা তিশা আরো বলেন, তিনি ইতোমধ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় ও বিসিক থেকে বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ জয়িতাসহ বেশ কিছু এ্যাওয়ার্ড। মাসে তার অনলাইন ব্যবসা থেকে দেড় লাখ টাকার মতো লাভ থাকে। তবে অনলাইনে নারীদের ব্যবসার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
পৌর শহরের ৩ নং ওয়ার্ডের কালীবাড়ি সড়কের উদ্যোক্তা ফাতেমা জাহান মোহনা গত দুই বছর যাবত অনলাইনে বিভিন্ন খাদ্যপণের ব্যবসা করছেন। বাসস’র সাথে আলাপকালে মোহনা জানান, বিভিন্ন ধরনের খাবার প্রস্তত করার আগ্রহ ছোট বেলা থেকেই তার। দুই বছর আগে করোনার মধ্যে অনেকের দেখাদেখি তিনিও অনলাইনে যুক্ত হয়ে ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে সংসারে কাজের ফাঁকে তিনি সব ধরনের বাংলা খাবার, চিকেন ফ্রাই, বিফ কারি, ভেজিটেবলস, সালাদ, বিভিন্ন ধরনের বিরিয়ানী, পোলাউ, শর্মা, পিজ্জা, সেন্ডউইচসহ অর্ডার মোতাবেক বিভিন্ন মজাদার খাবার তৈরি করেন। 
এ নারী উদ্যোক্তা জানান, প্রথমদিকে ছোট ছোট অর্ডার নিলেও এখন ব্যস্ততার জন্য নেন না। বিশেষ করে বার্থডে, মিলাদসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তার এসব খাদ্য পণ্যের বেশ চাহিদা রয়েছে। এছাড়া মেয়ে-জামাই বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য পিঠাসহ অনান্য খাবারও এখান থেকে ডালা করে সাজিয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। কাজ করতে পারলে প্রতিমাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে পরিবারের সহায়তা বেশ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
একই সড়কের আমতলা এলাকার বাসিন্দা কলেজ ছাত্রী মাহবুবা ইয়াসমিন প্রীতি বাসস’কে জানান, গত ৩ বছর ধরে লেখা পড়ার পাশাপাশি অনলাইনে মেয়েদের বিভিন্ন ড্রেস, কসমেটিক্স, জুয়েলারী, ব্যাগ, মাস্ক ইত্যাদির ব্যবসা করছেন। ভালোই সাড়া পাচ্ছেন। তাদের ‘ভোলা অনলাইন মার্কেট এন্ড আওয়ার কমিনিউকিটি’ নামে একটি গ্রুপ রয়েছে ফেইজবুকে, যার সদস্য প্রায় ১৭ হাজার। এটা অনলাইনে ব্যবসার একটি বড় প্লাটফর্ম। এর মাধ্যমে অনেক বিক্রেতারাই পণ্য বিক্রি করছেন সহজে। 
তিনি আরো জানান, বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষই অনলাইনের প্রতি ঝুঁকছেন, এতে এ খাত আরো প্রসারতি হচ্ছে। বিশেষ করে করোনার এ সময়ে অনলাইন মার্কেট জমজমাট থাকে। লেখা পড়ার পাশাপাশি অনলাইন থেকে বাড়তি আয়ে খুশি এ শিক্ষার্থী। বর্তমানে তার মতো অনেক ছাত্রী অনলাইনে ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন বলে জানান তিনি।
শহরের বিল্লাহ মসজিদ এলাকার গৃহিণী সাবিহা শারমিন তন্নি প্রায় দেড় বছর যাবত অনলাইনে যুক্ত আছেন কেকের ব্যবসায়। করোনার মধ্যে প্রথমে শখ থেকে করলেও এখন পরিবারের কাজ শেষে বাণিজ্যিকভাবেও তৈরি করছেন কেক। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এখন অনেক সচেতন। দোকান বা বেকারির কেকের চেয়ে ঘরে তৈরি কেক’র প্রতি আগ্রহ অনেক বেশি। আর এসব বিক্রিতে অনলাইন প্লাটফর্ম বর্তমানে একটি প্রধান মাধ্যম। ভোলায় অনেক নারীই বিকল্প এ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
তন্নি বলেন, তার তৈরি কেকের মধ্যে ভ্যানিলা কেক পাউন্ডপ্রতি ৫৫০ টাকা ও চকলেট কেক পাউন্ড ৬৫০ টাকায় বিক্রি হয়। খাবারের গুণগত মান সর্বোচ্চ বজায় রেখেইে তিনি এসব প্রস্তত করেন। মাসে তার ১০ হাজার টাকার বেশি আয় হয়। চেষ্টা আর উদ্যোগ থাকলে যে কেউ এখান থেকে ভালো টাকা উপার্জন করতে পারেন বলে মনে করেন তিনি। 
২ নং ওয়ার্ডের গাজীপুর রোডের নারী উদ্যোক্তা সামসাদ জেরিন বলেন, তিনি বেশ কবছর ধরে অনলাইনে মেয়েদের সব ধরনের পোশাকের ব্যবসা করছেন। ছেলেদের পোশাকের তুলনায় মেয়েদের ড্রেস বিক্রিতে অনেক বেশি সাড়া পাওয়া যায়। তাছাড়া নারী বিক্রেতা হওয়ায়,নারী ক্রেতারা স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন পণ্য ক্রয়ে। দেশ ডিজিটাল হওয়ায় এখন প্রায় প্রতি ঘরেই ইন্টারনেট সুবিধা রয়েছে। হাতে একটি এন্ড্রয়েট মোবাইল ফোন আর অল্প পুঁিজ থাকলে যে কেউ এ ব্যবসা শুরু করতে পারেন। সেক্ষেত্রে পণ্যের নিজস্বতা ও উদ্যোক্তার কঠোর পরিশ্রমী হতে হবে। এ খাতের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা বলেন এ নারী উদ্যোক্তা।
এ ব্যাপারে জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মো: ইকবাল হোসেন বাসস’কে জানান, সাম্প্রতিক জেলায় নারীরা অনলাইন ভিত্তিক বিভিন্ন ব্যবসায় জড়িত হয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ অনেক উদ্যোক্তাই সফলতার মুখ দেখছেন। এ ব্যবসার মূল অবদান হলো সরকারের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা। অনলাইন একটি অনেক বিশাল প্লাটফর্ম। এখান থেকে সারা বিশে^র বাজার ধরা অনেক সহজ। ঘরে বসেই খুলে যাচ্ছে সম্ভাবনার অপার দুয়ার। আমরা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। খুব শিগ্রই নারীদের জন্য জেলায় ডিসপ্লে ও মহিলা সেলস সেন্টার চালু করা হবে। এছাড়া নতুন নতুন নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে তারা কাজ করছেন বলে জানান ইকবাল হোসেন।
 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন