শিরোনাম

/ মো. আসাদুজ্জামান /
সাতক্ষীরা, ২০ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : টানা ২০ দিনের বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা। জলাবদ্ধতার কারণে পৌরসভার ইটাগাছা এলাকার নিম্নাঞ্চলের মানুষকে চলাচল করতে হচ্ছে ভেলায় চড়ে। বাজার করা, গবাদিপশুর খাবার আনা, শিশুদের স্কুলে নেওয়া কিংবা সংসারের প্রয়োজনীয় কাজ সবই করতে হচ্ছে ভেলায় চড়ে।
এদিকে জলাবদ্ধতার কারণে ভেঙে পড়েছে স্যানিটেশন ব্যবস্থা। ডুবে গেছে বাড়িঘর। পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। পৌরসভায় অচল হয়ে পড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও শহরতলিতে অপরিকল্পিতভাবে মাছের ঘের করাকে জলাবদ্ধতার কারণ বলছেন ভুক্তভোগীরা।
অতিবর্ষণে জেলায় দুই শতাধিক মৎস্য ঘেরের কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে বলে দাবি ঘের মালিকদের। এসময় ৬ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান ও সবজির ক্ষেত তলিয়ে গেছে।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বাসসকে জানান, গত ১ জুলাই থেকে ২০ জুলাই ভোর ৬ টা পর্যন্ত জেলায় মোট ৪৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা পৌরসভার ইটাগাছা এলাকার বাসিন্দা ও জেলা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলীনুর খান বাবুল জানান, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই জলাবদ্ধতায় জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়। এছাড়া, পৌরসভার মধ্যে কোনো মৎস্য ঘের করার নিয়ম না থাকলেও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কিছু ব্যক্তি মৎস্য ঘের করে পানি নিষ্কাশনের পথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এ কারণে পৌরসভার এক তৃতীয় অংশ পানির নীচে।
তিনি বলেন, শহরের পানি নিষ্কাশনের জন্য যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় এবং অপরিকল্পিতভাবে নদী-খাল খনন ও দখলের কারণে মানুষ বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতায় ভুগছে। ইতোমধ্যে টানা বর্ষণে তলিয়ে গেছে পৌরসভার ইটাগাছা, কামান নগর, কুখরালী, রসুলপুর, মেহেদিবাগ, মধু মোল্লার ডাঙ্গী, বকচরা, বাঁকাল, পলাশপোল, রইচপুর, পুরাতন সাতক্ষীরা, রাজার বাগান, বদ্দিপুর কলোনি, ঘুটির ডাঙ্গী ও কাটিয়া মাঠ পাড়াসহ নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা। পানি বন্দী হয়ে পড়েছে সাতক্ষীরার নিম্নাঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার।
আলীনুর খান বলেন, গুটি কয়েক লোক পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে অপরিকল্পিতভাবে মৎস্য ঘের করায় এবং অপরিকল্পিতভাবে নদী ও খাল খননের কারণে এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
বদ্দীপুর কলোনি এলাকার বাসিন্দা জবেদা খাতুন বলেন, এক যুগ ধরে জলাবদ্ধতার মধ্যে আছি। বৃষ্টি হলেই এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। রান্না-বান্না করা সম্ভব হয় না। ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে যেতে পারে না। প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মধ্যে বসবাস করেও ন্যূনতম নাগরিক সেবা পাই না।
রইচপুর এলাকার বাসিন্দা শাহিনুর রহমান জানান, রইচপুরের নিম্নাঞ্চলে অনেকগুলো মাছের ঘের। এসব ঘের এলাকায় পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এই জলাবদ্ধতার কারণে পানি বিষাক্ত হয়ে ঘরে ঘরে চর্মরোগ দেখা দিয়েছে।
জেলা নাগরিক অধিকার উন্নয়ন কমিটির সহ-সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, শহরের মধ্যে বিধিবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণ ও শহরতলিতে যত্রতত্র মাছের ঘের করাই জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। জলাবদ্ধতার কারণে স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীরা বিপাকে পড়েছে। জলাবদ্ধতা দূর করতে খালগুলো গভীর করে খনন ও খাল থেকে নেট-পাটা অপসারণের পরামর্শ দেন।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রুহুল আমিন জানান, অতিবর্ষণে জেলার ৬৩টি প্রাইমারি স্কুল জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। এর মধ্যে আশাশুনি উপজেলায় ২০টি, কলারোয়ায় ১০টি, তালায় ১টি, শ্যামনগরে ১২টি ও সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ২০টি স্কুল জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। স্কুলের চেয়ার ও বেঞ্চ ডুবে যাওয়ায় স্কুলগুলোতে ক্লাস চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তবুও কোমলমতি শিশুদের কথা ভেবে কষ্ট করে হলেও ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার বাগডাঙ্গি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস পরিচালনা করতে পারছেন না শিক্ষকরা।

জেলা মৎস্য অফিসার জিএম সেলিম বাসসকে বলেন, বৃষ্টির পানিতে জেলার দুই শতাধিক মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। যার আনুমানিক ক্ষয়-ক্ষতি প্রায় কোটি টাকা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, জেলায় ৬ হাজার হেক্টর আউশ ধানের ক্ষতি হয়েছে। আর কিছু সবজি খেত পচে গেছে।
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ বলেন, ইতোমধ্যে পানি নিষ্কাশনের জন্য নেট পাটা অপসারনসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। চিংড়ি চাষের স্বার্থে খালে নেট-পাটা বসিয়ে যারা পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছেন, তাদের স্বেচ্ছায় তা অপসারণ করতে হবে। অন্যথায় প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
তিনি বলেন, কতিপয় ঘের মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে যে, তারা চিংড়ি চাষের জন্য খালের স্বাভাবিক গতিপথ আটকে লাখো মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান, আপনারা অনতিবিলম্বে নিজ দায়িত্বে ঘেরের ও খালের সব অবৈধ বাঁধ ও নেট-পাটা খুলে দেবেন। খালের পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টির কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেবে এবং আইনগতভাবে যা যা করার প্রয়োজন, তাই করবে।