শিরোনাম

শাহজাহান নবীন
ঝিনাইদহ, ১৮ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রকৃত ভাস্কর্য প্রতিস্থাপনের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে কোথায় এই ভাস্কর্য স্থাপন করা হবে আগামীকাল সে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।
ইতোমধ্যে নির্মাণাধীন অবস্থায় পড়ে থাকা বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যের অপসারণ কাজ শুরু হয়েছে। ২০১৯ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হওয়া ভাস্কর্যটির সাথে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের মূল আকৃতি ও ছবির সাদৃশ্য না থাকায় তা অপসারণ করা হচ্ছে। ভাস্কর্যটির আংশিক কাজ হওয়ার পরেই সড়কের ঝুঁকি বিবেচনায় নির্মাণ কাজ বন্ধ করা হয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই। পরে একাধিকবার জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটিতেও স্থাপনাটি অপসারণে আলোচনা হয়। এসবের প্রেক্ষিতে সম্প্রতি স্থাপনাটির অপসারণ কাজ শুরু করেছে জেলা পরিষদ।
ঝিনাইদহ পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ ঝিনাইদহ পৌরসভার উদ্যোগে ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তৎকালীন পৌর মেয়র সাইদুল করিম মিন্টু ও জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে শুরু হয় ভাস্কর্যের নির্মাণ কাজ।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, নামেই কেবল ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ বলা হয়েছে। ভাস্কর্যের নামে এবড়োখেবড়ো একটি পাথর সদৃশ অবয়ব স্থাপন করা হয়। এমনকি নির্মাণ কাজ কয়েকমাস চলার পরে অজানা কারণেই তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে অসম্পূর্ণ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন অবহেলায় পড়ে থাকে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণ কাজ।
স্থানীয় সংস্কৃতি কর্মী আবু সাঈদ বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান আমাদের গর্ব। দলমত নির্বিশেষে আমরা তাঁকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা করি। কিন্তু বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য বানানোর নামে এখানে আসলে কী স্থাপন করা হয়েছে, তা স্পষ্ট ছিল না। ভাস্কর্যের কোনো নান্দনিকতা ছিল না। একটি এবড়োখেবড়ো উঁচু পাথর বসিয়ে তাকে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে ব্যবহার করা হয়েছে। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রকৃত ছবি বা অবয়বের সাথে এর কোনো মিল নেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই ভাস্কর্যটি নির্মাণের স্থান নির্বাচনেও ত্রুটি রয়েছে। এতে রাস্তা দিয়ে যাতায়াতকারী গাড়িগুলোর সাথে উল্টোদিক থেকে আসা গাড়ির প্রায়ই সংঘর্ষ হত।
দূরপাল্লার বাস চালক মিজানুর রহমান বাসসকে বলেন, ‘ঢাকা-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ও যশোর-কুষ্টিয়া মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশন এটি। এখানে মহাসড়কের মাঝখানে ৬ থেকে ৭ ফুট উঁচু বেদি। বেদির একপাশে গাড়ি থাকলে অন্যপাশে কিছুই দেখা যায় না। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটতো। ভাস্কর্য হোক, বা যেটাই হোক, সেটা উপযুক্ত স্থানে হওয়া উচিত ছিল। অপরিকল্পিতভাবে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ করা উচিত হয়নি।’
ঝিনাইদহ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আলী খান জানান, ২০১৯ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ ও তৎকালীন পৌর মেয়র ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। প্রাথমিক পর্যায়ে ১১ লাখ টাকা উত্তোলন করে কাজ শুরু করা হলেও পরে কি কারণে এই কাজ বন্ধ হয়ে যায় তা জানা নেই। বর্তমানে ভাস্কর্য নির্মাণ প্রকল্পের সেই ফাইলটি পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগের সরকারের সময়েই ভাস্কর্যটির নির্মাণ কাজ অজানা কারণে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। দীর্ঘদিন অযত্ন, অবহেলায় ভাস্কর্য চত্বরটি ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, ভাস্কর্যের নান্দনিকতা না থাকায় মাঝপথে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয় সরকার।
জেলা পরিষদের প্রশাসক এম এ মজিদ বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান দেশের গর্ব। ঝিনাইদহের আপামর জনগণের গর্ব। কিন্তু তার ভাস্কর্য তৈরির নামে অসুন্দর কোনো কিছু স্থাপন করা বীরশ্রেষ্ঠকে অবমাননা করা। দুটি মহাসড়কের সংযোগস্থলে ব্যস্ততম একটি ইন্টারসেকশন রয়েছে। সেখানে ইন্টারসেকশনের ওপরে ৬ থেকে ৭ ফুট উঁচু বেদি সম্বলিত ভাস্কর্য স্থাপন করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কর্মকর্তারা।
তিনি বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রকৃত অবয়ব ও ছবি থেকে প্রকৃত নান্দনিক ভাস্কর্য তৈরি করা হলে আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের লোকজন যখন যা মনে এসেছে, তাই করেছে। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই তারা মহাসড়কের ওপরে ভাস্কর্য করে অর্থ লুটপাট করেছে। সড়ক নিরাপত্তার কথাও তারা ভাবেনি।
সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কামালুজ্জামান জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার খবর দেখেছি। আমার জানামতে, সেখানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কোনো ভাস্কর্য ছিল না। একজন বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য তৈরি হলে তো জেলার মুক্তিযোদ্ধারা জানবেন। আমরা কিছুই জানতাম না।
জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, ভাস্কর্যটি আসলেই বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কিনা আমরা সেটা নিশ্চিত হতে পারিনি। সেখানে নান্দনিক কোনো স্থাপনা ছিল না। আবর্জনার স্তূপ ছিল। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে যে ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি করা হয়েছে, আসলেই সেটি বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ছবির সঙ্গে মেলে না। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনের মাঝখানে স্থাপনাটি দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করেছিল।
তিনি বলেন, অনেক আগেই জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে স্থাপনাটি অপসারণ ও প্রকৃত ভাস্কর্য স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আমরা বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রকৃত ছবির আদলে নান্দনিক ভাস্কর্য পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। আগামীকাল রোববার বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।