বাসস
  ১৮ জুলাই ২০২৬, ১৭:১২

বারি’র গবেষণায় বদলাচ্ছে উপকূলের কৃষির মানচিত্র, তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা

ছবি: বাসস

॥ এনামুল হক এনা ॥

পটুয়াখালী, ১৮ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)’র গবেষণায় দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় লবণাক্ত মাটিতে বিদেশি উন্নত জাতের আম ও বারোমাসি পেয়ারার চাষের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা আর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় কৃষি ছিল নানা প্রতিকূলতার মুখে। যেখানে একসময় ভালো ফসল উৎপাদনই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে এখন বারি’র গবেষণার হাত ধরে যুক্ত হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার লেবুখালীতে অবস্থিত বারির আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র উপকূলীয় এলাকার আবহাওয়া, মাটি ও পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফলের জাত নির্বাচন ও চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করছে। এরই অংশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নত জাতের আম নিয়ে চলছে গবেষণা। একাধিক মৌসুমের পরীক্ষায় কয়েকটি জাত ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে।

বারি’র গবেষণা কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, গত ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৩১টি বিদেশি (এক্সোটিক) আমের জার্মপ্লাজম নিয়ে মাঠপর্যায়ে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এসব জাতের অভিযোজন ক্ষমতা, ফলন, ফলের আকার, রং, স্বাদ, মিষ্টতার মাত্রা, খাওয়ার উপযোগী অংশ, সংরক্ষণক্ষমতা এবং রোগ প্রতিরোধের সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

গবেষণায় কয়েকটি জাত বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। পরীক্ষাধীন জাতগুলোর মধ্যে মিয়াজাকি (গও চক-০১৮), লেডি জেন (গও চক-০২১), চিয়াংমাই (গও চক-০২৬), তাইওয়ান রেড (গও চক-০৩২), কুজাই (গও চক-০৩৪) এবং কিং চাকাপাত (গও চক-০৩৯) জাতের আমে আকর্ষণীয় লাল খোসার বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। দেশের বাজারে লাল খোসার আম এখনও খুব বেশি প্রচলিত নয়। ফলে এসব জাত সফল হলে নতুন বাজার তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানির সম্ভাবনাও সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

আকারের দিক থেকেও গবেষণায় চমকপ্রদ ফল পাওয়া গেছে। ব্রুনাই কিং (গও চক-০৪২) জাতের একটি আমের ওজন পাওয়া গেছে ২ হাজার ৩৫১ গ্রাম, যা পরীক্ষাধীন জাতগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। সাধারণ জাতের আমের তুলনায় এর আকার অনেক বড় হওয়ায় এটি কৃষক ও ভোক্তাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করতে পারে।

ফলের গুণগত মান বিশ্লেষণেও বেশ কিছু জাত ভালো ফল দেখিয়েছে। এর মধ্যে চিয়াংমাই (গও চক-০২৬) জাতের আমে ৮১ শতাংশ খাওয়ার উপযোগী অংশ পাওয়া গেছে, যা পরীক্ষাধীন জাতগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ এ জাতের আমে আঁটি ও খোসার তুলনায় শাঁসের পরিমাণ বেশি। অন্যদিকে সাদা দোফালা (গও চক-০২২) জাতের আমে ২৬ শতাংশ ব্রিক্স বা দ্রবণীয় শর্করা পাওয়া গেছে, যা এর উচ্চ মিষ্টতার নির্দেশক।

ফলনের সম্ভাবনার দিক থেকেও কয়েকটি জাত এগিয়ে রয়েছে। গবেষণায় চিয়াংমাই (গও চক-০২৬) জাতের সম্ভাব্য উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ২ দশমিক ৭৩ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া কিংস্টন প্রাইড (গও চক-০৩৩) এবং কাটিমন (গও চক-০১৭) জাতও ফলনের ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে।

গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চোকানোন (গও চক-০৪০) জাতের আমে মৌসুমের বাইরেও ফল ধারণের বৈশিষ্ট্য পাওয়া। দেশে সাধারণত মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত আমের প্রধান মৌসুম হলেও এ ধরনের জাত বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকরা অফ-সিজনেও উৎপাদন করে বাড়তি বাজারমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

সংরক্ষণক্ষমতার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। বানানা ম্যাঙ্গো (গও চক-০১৫) জাতের আম ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ৯ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ এবং ভবিষ্যতে রপ্তানির ক্ষেত্রেও এটি সুবিধাজনক হতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, বিদেশি জাতের আম নিয়ে এই গবেষণার মূল লক্ষ্য শুধু নতুন জাত খুঁজে বের করা নয়; বরং উপকূলীয় পরিবেশে টেকসই ও লাভজনক ফলচাষের উপযোগী প্রযুক্তি তৈরি করা। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকদের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

তারা আরও বলেন, গবেষণার পরিধি শুধু বিদেশি আমের জাত নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নেই। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিকূল পরিবেশে কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার আরেকটি ক্ষেত্র হিসেবে বারির আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র কাজ করছে বারোমাসি পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফলের জাত ও প্রযুক্তি নিয়ে।

জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা উপকূলীয় কৃষির বড় বাধা হলেও গবেষকরা মনে করছেন, সঠিক জাত নির্বাচন এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করলে এসব এলাকাতেও ফলবাগান গড়ে তোলা সম্ভব। এ লক্ষ্যে জলাবদ্ধ এলাকায় বারোমাসি পেয়ারা এবং লবণাক্ত পরিবেশে আম ও পেয়ারা চাষের উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজ এগিয়ে চলছে।

গবেষণা কেন্দ্রের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। উন্নত জাতের চারা সরবরাহ, বাগান ব্যবস্থাপনা, সার প্রয়োগ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক পরিচর্যা পদ্ধতি বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ফলচাষে আগ্রহ বাড়ছে।

দুমকী উপজেলার কৃষক মো. আব্দুল করিম বাসস’কে বলেন, আগে উপকূলীয় এলাকায় বিদেশি জাতের আম চাষের বিষয়ে কৃষকদের মধ্যে তেমন ধারণা ছিল না। কিন্তু বারি’র গবেষণার মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। 

তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে আমের বাগান করে গাছের বৃদ্ধি ও ফলনের বিষয়ে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। উন্নত জাতের চারা সহজে পাওয়া গেলে আরও অনেক কৃষক এ কাজে আগ্রহী হবেন।

বাউফল উপজেলার কৃষক মোছা. রেহানা বেগম বলেন, উপকূলীয় এলাকায় কৃষকদের আয়ের উৎস সীমিত। ধানের পাশাপাশি ফলচাষ বাড়ানো গেলে কৃষকদের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, পেয়ারা চাষের পাশাপাশি এখন আমবাগান করার দিকেও আমাদের এলাকার অনেক কৃষক আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

মির্জাগঞ্জ উপজেলার কৃষক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিতে ঝুঁকি বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষিকে বহুমুখী করা জরুরি। তবে উন্নত চারা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ফলচাষ আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।

বারি’র আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলিমুর রহমান বাসস’কে বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া ও জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করেই গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। বিদেশি আমের জার্মপ্লাজমগুলোর অভিযোজন ক্ষমতা, ফলন, গুণগত মান, সংগ্রহকাল এবং সংরক্ষণক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, গবেষণায় অধিকাংশ জাতই ফলের আকার, রং, স্বাদ, খাওয়ার উপযোগী অংশ এবং সংরক্ষণক্ষমতার দিক থেকে আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। তবে একটি বা দুটি মৌসুমের ফলাফলের ভিত্তিতে কোনো জাত চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয় না। একাধিক মৌসুমের তথ্য বিশ্লেষণের পর দক্ষিণাঞ্চলের জন্য সবচেয়ে উপযোগী জাত নির্বাচন করা হবে।

ড. আলিমুর রহমান আরও বলেন, গবেষণার পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকরা যাতে আধুনিক ফলচাষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে লাভবান হতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।