বাসস
  ১৮ জুলাই ২০২৬, ১৪:৪০

শেরপুরের গারো পাহাড়ে লটকন চাষে নতুন সম্ভাবনা 

ছবি: বাসস

॥ জাহিদুল খান সৌরভ ॥

শেরপুর, ১৮ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : জেলার গারো পাহাড়ের পতিত জমিতে লটকন চাষের নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ে দিন দিন বাড়ছে লটকন চাষ| বছরের পর বছর অনাবাদী জমিতে এখন চাষ হচ্ছে লটকনের বাগান| তুলনামূলক কম পরিচর্যা, ভালো বাজারদর এবং লাভজনক হওয়ায় লটকন চাষে আগ্রহ বাড়ছে উপজেলার কৃষকদের মাঝে।

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের ভারুয়া গ্রামের সফল কৃষি উদ্যোক্তা হামিদুল্লাহ। ২০০৭ সালে নরসিংদীতে তার চাচার লটকন বাগান দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে বাড়ি সংলগ্ন পতিত জমিতে উচ্চ ফলনশীল লটকনের চারা রোপণ করেন তিনি। দীর্ঘ পরিচর্যার পর ২০১৪ সাল থেকে শুরু করেন বাণিজ্যিকভাবে লটকন বিক্রি।

বর্তমানে কৃষি উদ্যোক্তা হামিদুল্লাহর ৬৫ শতক জমিজুড়ে রয়েছে লটকনের বাগান। চলতি মৌসুমে প্রতিটি গাছেই লটকনের অধিক ফলন হয়েছে এবং গাছ প্রতি গড় ফলন ৬ থেকে ৮ মণ| এ বছর  বাগান থেকে তিনি প্রায় ২ লাখ টাকার লটকন বিক্রি করেছেন।

ছবি: বাসস

জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ঝিনাইগাতী উপজেলায় প্রায় ৩ হেক্টর জমিতে লটকন চাষ হয়েছে| উঁচু-নিচু পাহাড়ি ও বসতবাড়ির আশপাশে ছায়াযুক্ত পরিত্যক্ত জমির পাশাপাশি ছায়াযুক্ত স্থান লটকন চাষের জন্য উপযোগী| অতীতে এসব জমিতে তেমন কোনো ফসল হতো না| এখন লটকন চাষ করে লাভবান হচ্ছেন পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষকরা।

সরেজমিনে কৃষি উদ্যোক্তা হামিদুল্লাহর সঙ্গে আলাপকালে বাসস’কে বলেন, লটকন চাষ তুলনামূলকভাবে সহজ ও লাভজনক| বছরে এক থেকে দুইবার সেচ এবং গাছের গোড়ায় ˆজব সার ব্যবহার করলে গাছে প্রচুর ফলন আসে| এছাড়া ফল ধরার সময় পোকার আক্রমণ হলে সামান্য কীটনাশক প্রয়োগ করলে উপকার পাওয়া যায়| তাই লটকন চাষে বাড়তি খরচ বা পরিশ্রম ছাড়াই দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।

উপজেলার ভারুয়া গ্রামের কৃষক মো. রায়হান আলী বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করে আসছি| তবে গত কয়েক বছরে গারো পাহাড় এলাকায় লটকন চাষের যে সাফল্য দেখেছি, তাতে আমি বেশ আগ্রহী হয়েছি| এখানকার উঁচু জমি, অনুকূল আবহাওয়া এবং মাটির গুণাগুণ লটকন চাষের জন্য খুবই উপযোগী| তুলনামূলকভাবে লটকন বাগানের পরিচর্যা ও খরচ কম হলেও ফলন ভালো হয় এবং বাজারে এর চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে| আমাদের এলাকার অনেক কৃষক লটকন বিক্রি করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাদের সাফল্য দেখে আমিও লটকন বাগান করার পরিকল্পনা নিয়েছি| কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পেলে আমিও আধুনিক পদ্ধতিতে লটকন চাষ করে ভালো আয় করতে পারব।

ছবি: বাসস

একই উপজেলার আহমেদনগর গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মোহাম্মদ মুজাহিদ বাসস’কে বলেন, গারো পাহাড় অঞ্চলে লটকন এখন একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফল হিসেবে পরিচিত| আগে এ পাহাড়ি এলাকার অনেক জমি অনাবাদি বা কম উৎপাদনশীল ছিল| এখন সেই জমিতেই লটকনের বাগান গড়ে উঠছে এবং কৃষকরা ভালো আয় করছেন| আমি উপজেলার বিভিন্ন বাগান ঘুরে দেখেছি| একটি পরিণত লটকন বাগান থেকে প্রতিবছর লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা এসে সরাসরি বাগান থেকে ফল কিনে নিয়ে যান, ফলে বাজারজাতকরণ নিয়েও তেমন সমস্যা হয় না| এ কারণে আমিও লটকন চাষে আগ্রহী হয়েছি| সরকারি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং উন্নত জাতের চারা পাওয়া গেলে গারো পাহাড়ে লটকন চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে এবং কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি| এতে যেমন বাড়বে উৎপাদন, তেমনি তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন বাসস’কে বলেন, চলতি বছর জেলায় ২১ হেক্টর জমিতে লটকন চাষ হয়েছে| এ জেলার মাটি ও আবহাওয়া লটকন চাষের জন্য খুবই উপযোগী| তাই আমরা কৃষকদের লটকন চাষে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছি| পরিকল্পিতভাবে চাষ বাড়লে লটকন এই অঞ্চলের অন্যতম লাভজনক ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে| এছাড়া পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ও লাভজনক এই ফলের চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে পাহাড়ি অঞ্চলের পতিত জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে| পাশাপাশি বাড়বে কর্মসংস্থান ও শক্তিশালী হবে স্থানীয় অর্থনীতি।