শিরোনাম

মোশতাক আহমদ
ঢাকা, ১৫ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : চলমান বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে চট্রগ্রাম, কক্সবাজার ফেনীসহ অন্যান্য জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতে মজুদ রয়েছে ১৩ লাখ জিও (জিওটেক্সটাইল ব্যাগ)।
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটিই তুলে ধরেছেন।
আজ বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের নিজ কার্যালয়ে প্রতিমন্ত্রী দেশের বন্যা পরবর্তী সরকারের প্রস্তুতি ও ত্রাণ সহায়তা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ দ্রুত মেরামত এবং নদীভাঙ্গন রোধে ইতোমধ্যে ৭ লাখের বেশি জিও ব্যাগ সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া আরও ৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি জিও ব্যাগ এবং প্রায় ৬৫ হাজার সিনথেটিক জিও ব্যাগ মজুদ রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৩ লাখ জিও ব্যাগ প্রস্তুত রয়েছে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হবে।
চলমান বন্যায় এখন পর্যন্ত দেশের সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব সরকারের হাতে এখনও পৌঁছায়নি-এমনটি জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগ এবং সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর তথ্য সংগ্রহের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আজ বুধবার বিকেলের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশেষভাবে চট্টগ্রাম বিভাগ এবং সিলেট অঞ্চলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। একই সঙ্গে ফেনীর অবস্থাও আমাদের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। সেখানে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।’
প্রতিমন্ত্রী জানান, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ফেনী, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং চট্টগ্রাম বিভাগের পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা মাঠপর্যায়ে অবস্থান করছেন। কোথাও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে কিংবা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া মাত্রই তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, যত দ্রুত সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত সøুইস গেট সচল করা এবং যেসব স্থানে পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে, সেগুলো সমাধান করা। আশা করছি, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অধিকাংশ জরুরি কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে’ প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বাসস’কে জানান, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের কয়েকটি এলাকায় বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজারের একটি এলাকায় অতিরিক্ত পানির চাপ কমাতে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় তিনটি স্থানে নিয়ন্ত্রিতভাবে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে একটি স্থানে পানির তীব্র স্রোতে বাঁধ ভেঙে যায়। সেখানে জিও ব্যাগ ব্যবহার করে জরুরি ভিত্তিতে পুনর্নিমাণের কাজ চলছে।
আগামী ১৫ দিনের মধ্যে চলমান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঁধগুলোর জরুরি মেরামত কাজ সম্পন্ন হবে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে বন্যা ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ নিয়ে সম্প্রতি নেদারল্যান্ডস দূতাবাস আয়োজিত একটি সেমিনারে দেশটির রাষ্ট্রদূত ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন এবং পানি সংরক্ষণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, নেদারল্যান্ডস পৃথিবীর অন্যতম সফল পানি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের মতো নদীবহুল দেশের জন্য তাদের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।
প্রতিমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে নেদারল্যান্ডস সরকারের সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সমঝোতা করেন এবং ১৯৭৯ সালে দেশটি সফর করে বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শন করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে চায়।
তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ পোল্ডার ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে নির্মিত হয়েছিল। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে অনেক বাঁধ ও পোল্ডার এখন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত পানি জমে গেলে স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে অনেক সময় নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিতে হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এসব অবকাঠামোর আধুনিকায়নের বিকল্প নেই।
বাজেট প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় নির্ধারিত বাজেট পেয়েছে। তবে বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হলে সরকার প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেবে বলে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্ষা মৌসুমে সম্ভাব্য নদীভাঙ্গন মোকাবিলায় দেশের বিভিন্ন জেলার সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক এবং স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি স্থানের চাহিদা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ স্থানে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি প্রায় ১ হাজার স্থানে কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে প্রতিটি এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজন অনুযায়ী জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। কোথাও ৫০ মিটার, কোথাও ২০০ মিটার, আবার কোথাও ৫০০ বা ৭০০ মিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, প্রতিটি স্থান পরিমাপ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
জিও ব্যাগ ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, অতীতে জিও ব্যাগ নিয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে সেই সুযোগ নেই। প্রতিটি জিও ব্যাগে নির্ধারিত পরিমাণ বালু ভরা হচ্ছে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কাজ সম্পন্ন হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি প্রকল্প এলাকায় সাইনবোর্ড টানিয়ে জনগণকে জানানো হচ্ছে কতটি জিও ব্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। জনগণ নিজেরাই কাজ পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে কোথায় কতগুলো জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে, সেটিও যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষায়, আগে হয়তো ৫০টি জিও ব্যাগ ফেলে ১০০টির বিল নেয়ার অভিযোগ ছিল। এখন ৯৯টি ব্যাগ ফেলে ১০০টির বিল নেয়ারও কোনো সুযোগ নেই। সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, যেকোনো এলাকা থেকে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলীকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হচ্ছে। তারা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করছেন। এসব কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
কোনো ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে, এমনকি প্রয়োজনে কার্যাদেশ বাতিলও করা হবে।
তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে সম্ভাব্য প্রয়োজন বিবেচনায় প্রায় ৩০ লাখ জিও ব্যাগ ব্যবহারের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে এবং সে অনুযায়ী বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। কোথাও জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে দ্রুত জিও ব্যাগ সরবরাহে কোনো ধরনের ঘাটতি হবে না।
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু চলমান বন্যা মোকাবিলাই নয়, ভবিষ্যতের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকেও আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে কাজ করছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বন্যা ও নদীভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।