বাসস
  ১৩ জুলাই ২০২৬, ১৪:২৪

কৃষকের বন্ধু হয়ে উঠেছেন রাজবাড়ীর সফল উদ্যোক্তা হোসেন আলী

,পাংশা উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা হোসেন আলী কৃষকদের জন্যও তৈরি করেছেন সময়োপযোগী কয়েকটি কৃষি যন্ত্র। ছবি: বাসস

/মোশারফ হোসেন/

রাজবাড়ী, ১৩ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : দারিদ্র্য, অভাব আর অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করেই জীবনের পথচলা শুরু। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে সেই সংগ্রামকে সাফল্যে রূপ দিয়েছেন রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা হোসেন আলী (৩৫)। নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে তিনি শুধু আত্মনির্ভরই হননি, কৃষকদের জন্যও তৈরি করেছেন সময়োপযোগী কয়েকটি কৃষি যন্ত্র।

পাংশা উপজেলার মৌরাট ইউনিয়নের স্বর্ণলতা গ্রামের অত্যন্ত অসচ্ছল পরিবারে জন্ম হোসেন আলীর। বাবা আমীর আলী ও মা রাবেয়া বেগমের ৮ সন্তানের মধ্যে তিনি সবার ছোট। 

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই সংসারে নেমে আসে চরম অভাব। এর একপর্যায় পড়ালেখা ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে হয় তাকে। পাংশা শহরের একটি ওয়ার্কশপে কুষ্টিয়ার অভিজ্ঞ মিস্ত্রি জামাত আলীর কাছে কাজের সুযোগ পান হোসেন আলী। কাজের শুরুতে মজুরি ছিল শুধু খাবারের ব্যবস্থা। 

ওয়ার্কশপে কাজ করাকালীন সময়ে তিনি বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রের গঠন, ব্যবহার ও মেরামতের কৌশল রপ্ত করেন। একসময় তার ওস্তাদ জামাত আলী হৃদরোগে মারা যান। পরবর্তীতে ওয়ার্কশপের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। সেই কঠিন সময়ই হোসেন আলী আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। 

পরবর্তীতে পাংশা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় তিনি গাজীপুরের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত ‘সিমিট বাংলাদেশ’ থেকেও আধুনিক কৃষি যন্ত্র তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। এসব প্রশিক্ষণ তার উদ্ভাবনী চিন্তাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

পাংশা অঞ্চলে প্রতিবছরই প্রচুর পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে কৃষকদের কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়। এই সমস্যার সমাধানে হোসেন আলী তৈরি করেন স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের উপযোগী এয়ার ফ্লো পেঁয়াজ সংরক্ষণ মেশিন, যেখানে একসঙ্গে ২শ’ থেকে ৩শ’ মণ পেঁয়াজ দীর্ঘদিন ভালো রাখা সম্ভব। এরপর তিনি উদ্ভাবন করেন পেঁয়াজ গ্রেডিং মেশিন, যা সহজেই ছোট-বড় পেঁয়াজ আলাদা করতে পারে।

এ ব্যাপারে পাংশা বাগদুলি গ্রামের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সোহান আলী বাসস’কে বলেন, আমি পেঁয়াজের ব্যবসা করি। অল্প সময়ে পেঁয়াজ বেছে বাজারে বিক্রি করা আমার জন্যে এখন খুব সহজ হয়েছে। হোসেন আলীর তৈরি পেঁয়াজ গ্রেডিং মেশিন কিনে আমি খুব উপকৃত হয়েছি। এছাড়া ঘাস কাটার মেশিন এবং সর্বশেষ কাঁচা পাটের আঁশ ছাড়ানোর মেশিন তৈরি করে তিনি কৃষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

এ বিষয়ে হোসেন আলী বাসস’কে বলেন, ‘তার উদ্ভাবিত পাটের আঁশ ছাড়ানোর মেশিন এক ঘণ্টায় প্রায় ১শ’ আঁটি কাঁচা পাটের আঁশ ছাড়াতে সক্ষম। এতে শ্রমিকের প্রয়োজন অনেক কমে যায়। মেশিনে আঁশ দ্রুত ছাড়িয়ে শুধু পানিতে ভিজিয়ে রাখলেই কয়েক দিনের মধ্যে পাওয়া যায় উজ্জ্বল সোনালি আঁশ’।

চাঁদপুর থেকে আসা কৃষক কাউসার আহমেদ বাসস’কে বলেন, ‘আমি বাণিজ্যিকভাবে পাট চাষ করি। এত পাটের আঁশ শ্রমিক দিয়ে ছাড়াতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগে। এছাড়া আজকাল অধিক মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায়না। তাই হোসেন আলীর তৈরি মেশিনটি আমার কাজ অনেক সহজ করে দেবে বলেই কিনেছি।’

বর্তমানে হোসেন আলীর ওয়ার্কশপে পাঁচজন কর্মী নিয়মিত কাজ করেন। প্রতি মাসে তার মেশিন বিক্রি, কর্মচারীর বেতন দিয়ে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা আয় হয়। এতে সে খুবই খুশি। বিভিন্ন জেলার কৃষকরাও তার তৈরি যন্ত্র কিনতে আসছেন তার কাছে। স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও তার উদ্ভাবিত কৃষিযন্ত্রের চাহিদা বাড়ছে।

জীবনের শুরুর দিনের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন হোসেন আলী। চোখ ভিজে আসে তার। তিনি বলেন, ‘এক সময় পেটের ভাতের জন্য কাজ করেছি। আজ আমার তৈরি মেশিন কৃষকের কাজে লাগছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সামনে আরও আধুনিক কৃষিযন্ত্র তৈরি করে দেশের কৃষিকে এগিয়ে নিতে চাই।’

হোসেন আলীর জীবনগাথা প্রমাণ করে, দারিদ্র্য কখনো সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না। অধ্যবসায়, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তার সমন্বয় ঘটাতে পারলে একজন সাধারণ মানুষও সমাজে পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। তার সাফল্য আজ শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এ ব্যাপারে পাংশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তোফাজ্জেল হোসেন বাসস’কে বলেন, হোসেন আলীর মধ্যে প্রযুক্তির উদ্ভাবনী গুণ রয়েছে দেখেই তাকে আমরা গাজীপুর কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে পাঠিয়েছি। তার কর্ম দক্ষতা ও একাগ্রতা দেখে তাকে সব সময় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছি।

তিনি বলেন, একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে এলাকায় সুনাম অর্জন করেছে হোসেন আলী। এ ব্যাপারে সম্প্রতি পাংশায় অনুষ্ঠিত কৃষি মেলায় রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন তার উদ্ভাবনী প্রযুক্তি দেখে তাকে অনেক সাহস জুগিয়েছেন। কোন সমস্যা দেখা দিলে জেলা প্রশাসককে জানানোর জন্য বলেছেন তিনি।