শিরোনাম

//আনোয়ার হোসেন শামীম//
গাইবান্ধা, ৯ জুলাই, ২০২৬, (বাসস): জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা, করতোয়া ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক মাসে নদীর পানি কখনও কম, আবার কখনও বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন পয়েন্টে তীব্র নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে।
অব্যাহত ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে শত শত বিঘা ফসলি জমি ও বসতভিটা। চোখের সামনে নিজেদের শেষ সম্বল হারিয়ে ও বাড়ি-ঘর হারানোর আতঙ্কে দিন পার করছেন নদীপাড়ের হাজারো বাসিন্দা। অন্যদিকে ভাঙনরোধে নিয়মিত কাজ করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রায় ৪০ দিন ধরে গাইবান্ধা জেলার সবগুলো নদ-নদীর পানি কখনো বাড়ছে, আবার কখনো কমছে। আর এই পানি ওঠানামার সাথেই শুরু হয়েছে নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে তীব্র ভাঙন।
অন্যদিকে, দুইদিনের টানা বৃষ্টিতে জেলার কাঁচা রাস্তাসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে কৃষকদের বোরো ধানের বীজ তলা, আউশধান বিভিন্ন ফসলসহ শাক সবজি নষ্ট হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার সাত উপজেলায় বন্যায় প্রায় ১১৮ হেক্টর জমির ফলস নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে আউশ ৪৫, পাট ৩০, তিল ২৫, আমন বীজতলা-৮ ও শাকসবজি ১০ হেক্টর।
গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আজ বৃস্পতিবার বিকেল তিনটা পর্যন্ত তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে এক সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৩৫ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৫৯ সেন্টিমিটার ও গোবিন্দগঞ্জের করতোয়া নদীর পানি চকরহিমাপুর স্টেশন পয়েন্টে ৯৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ২৯৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চলমান বন্যার মওসুমে এখন পর্যন্ত গাইবান্ধায় কোনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
ভাঙন সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় ও জেলার পাউবো সূত্রে জানা গেছে, চলতি মওসুমে গাইবান্ধার প্রধান নদ-নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি ও কমার মধ্যে ভাঙন অব্যহত রয়েছে। ভাঙন এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়তই নতুন করে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি।
গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে চলমান পানি বৃদ্ধি শুরুর থেকে জেলার চার উপজেলার অন্তত ২৬টি পয়েন্টে ভাঙন চলছে।
জেলার বাসিন্দারা জানান, সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিভিন্নস্থানে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি বাঁধ। এতে সরকারি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় তিস্তা নদীর গ্রাসে কাপাসিয়া, বেলকা, চন্ডিপুর ও শ্রীপুর ইউনিয়নের বিভিন্নস্থানে ভাঙনে বসতভিটাসহ শত শত বিঘা ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
ইতোমধ্যে চরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কয়েকটি সরকারি বেসরকারি স্থাপনা ঝুঁকিতে আছে বলে জানা গেছে।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারী, কামারজানি ও মোল্লারচরে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মোল্লারচর ইউনিয়নটি চরাঞ্চলে হওয়ায় প্রতিবছর ভাঙনে বিলীন হওয়া পথে। ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের রসুলপুর, উড়িয়া ইউনিয়নে কাঁটাতার এলাকায় তীব্র নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। সাঘাটা উপজেলার চরাঞ্চলের বিভিন্নস্থানে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাশিমপুর বাজারে ৬৫ বছরের জেলেখা বেওয়া বলেন, প্রত্যক বছর নদী ভাঙন সব শেষ হয়ে গেছে। আমার ফসলিসহ বলতে আর কিছু নাই। বসতভিটা গত তিন বছর আছে ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে। অন্যের জায়গায় ঘর তুলে আছি। বন্যা না আসতেই যে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। এবার বুঝি এ ঘর কোনাও নদীত পড়ে যায়। এমন আশঙ্কা করছেন তিনি।
একই এলাকার আলেয়া বেগম জানান, কয়েক দিন আগে ভাঙনে তার বাড়ি নদীতে চলে গেছে। এখন দিনে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেন আর রাতে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নেন। দ্রুত নদী রক্ষার কাজ না করলে পুরো এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। তাদের দুইজনের মতোই ওই এলাকার ১৫টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। হুমকির মুখে পড়েছে ওই এলাকার প্রায় দেড় কিলোমিটার জুড়ে থাকা স্কুল, মসজিদসহ কয়েক শতাধিক পরিবারের বসতভিটা ও ফসলি জমি।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার মোল্লাচর ইউনিয়নের বদিদুজ্জামান বদি বলেন, ইউনিয়ন সম্পূর্ন চরের মধ্য। প্রতি বছর কয়েক দফা করে ভাঙনের শিকার হয়। নদী ভাঙতে ভাঙতে ইউনিয়নটি বিলিনের পথে এখন।
ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, নদীতে তেমন একটা পানি বৃদ্ধি হয়নি। এরই মধ্যে কয়েকটি বসতভিটাসহ শতাধিক ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত সরকারি বা স্থানীয় কোনো প্রতিনিধি এলাকায় আসে নাই।
তিনি আরও বলেন, আমরা কারো কাছে সাহায্য চাই না। নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধান চাই।
সাঘাটা ইউনিয়নের হলদিয়া গ্রামের খুরশিদ মিয়া বলেন, বন্যায় উপজেলায় চরাঞ্চলের অনেক ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রত্যেক বছর বন্যায় চরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয়। যাহা রক্ষা করা সম্ভব না।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তররের উপ- পরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, বন্যায় ও টানা বৃষ্টিতে জেলায় শাক- সবজি, বোরো ধানের চারা, আউশধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। যাতে ফসল হানি কম হয়, সেজন্য মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, নদ-নদীর পানি হ্রাস-বৃদ্ধির কারণে ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। বাঁধের কাজ যেসকল এলাকায় অসম্পূর্ণ রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যই শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে তাগিত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভাঙন প্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রতিরোধ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।