শিরোনাম

॥ মো. আসাদুজ্জামান ॥
সাতক্ষীরা, ৪ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : বিলুপ্তির পথে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব মাদুর শিল্প। ন্যায্য দাম না পাওয়ায় এ পেশা থেকে সরে আসছেন অনেকেই। অনেকে আবার পিতৃপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এ শিল্পে জড়িয়ে আছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পরিবেশবান্ধব এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে দরকার সরকারি পৃষ্টপোষকতা।
জানা যায়, এককালে সাতক্ষীরা জেলা মাদুর শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। জেলার আশাশুনি উপজেলার বড়দল, কুল্যা ও কাদাকাটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ন এলাকা জুড়ে ‘মেলে ঘাস’ জন্মাতো। স্থানীয় লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা নির্বাহ হতো এ শিল্প থেকে।
দক্ষিণ খুলনার এক সময়ের বৃহত্তম হাট ছিল বড়দল। এই হাটে প্রচুর মাদুর বিক্রি হতো পাইকারি দামে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এসে এই হাটে মাদুরসহ বিভিন্ন সওদা করে নিয়ে যেতো। এছাড়া বুধহাটা হাটেও একসময় প্রচুর মাদুর বিক্রি হতো। প্রতি রোববার বড়দল হাটে এবং শুক্রবার ও সোমবার বুধহাটা হাটে বসতো মাদুরের হাট। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদুর কারিগরা প্রতি সপ্তাহে তাদের তৈরি করা মাদুর এনে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করতেন। সেসব মাদুর চলে যেতো খুলনা, যশোরসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায়। তবে এখন আর আগের মতো এসব হাটে প্রচুর মাদুর বিক্রি হয়না।
বর্তমানে খাটের ওপর তোষক, বিছানার চাদর ও প্লাস্টিকের মাদুরের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় কদর কমে গেছে এই মাদুর শিল্পের। আশাশুনি ও তালা উপজেলায় কিছু কিছু এলাকার মানুষ পারিবারিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এখনো ধরে রেখেছেন মাদুর বোনার কাজে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে নারীদের অবদানই বেশি। জেলার আশাশুনি ও তালা উপজেলার প্রায় তিন শতাধিক পরিবারের আয়ের উৎস এই মাদুর বুনন। চাক্যচিক্য কম হলেও মেলে ঘাসের মাদুর পরিবেশ বান্ধব। আর এই পরিবেশ বান্ধব শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে দরকার সরকারি পৃষ্টপোষকতা।
আশাশুনি উপজেলার বড়দল গ্রামের মাদুর কারিগর সুধীর মন্ডল বাসসকে বলেন, এই মাদুর বিক্রি করে সংসার চালাই। ছেলের লেখাপড়ার খরচ যোগাই। বাইরে থেকে মাদুর আসছে বলে, আগের চেয়ে মাদুরের দাম কম পাচ্ছি। লাভ তেমন একটা নেই। তবুও এ পেশা ধরে রেখেছি। বয়স হয়েছে। এটা ছাড়া অন্য কিছু করতে পারিনা।
তিনি বলেন, মাদুর বুনে এখন আর আগের মতো লাভ নেই। মেলে ঘাস কিনতে হয় বাকীতে। মাদুর বেচে সেই মেলে ঘাসের দাম দিতে হয়। এছাড়া আগে প্রচুর মেলে বা পাতি উৎপাদন হতো, এখন আর হয়না।
তিনি বলেন, একটা ছোট আকারের মাদুর তৈরি করতে খরচ হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। যা বিক্রি হয় ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকায়। আর বড় সাইজের মাদুর তৈরি করতে খরচ পড়ে যায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। যা বিক্রি হয় ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। লাভ খুবই সীমিত। অল্প কিছু থাকে, তাই দিয়ে সংসার চালাতে হয়। বাড়িতে মাদুর তৈরি করে বড়দল বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করি।
সুধীর মন্ডলের স্ত্রী সরলা রাণী মন্ডল জানান, সংসারের কাজের পাশাপাশি তিনি তার স্বামীকে এ কাজে সহযোগিতা করেন। তবে এই পেশায় থেকে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
কচুয়া গ্রামের মাদুর ব্যবসায়ী লুৎফর মোড়ল জানান, বড়দল, খাজরা, বাইনতলাসহ বিভিন্ন বাজার থেকে পাইকারী মাদুর কিনে তা সাতক্ষীরা, পাটকেলঘাটা ও খুলনায় বিক্রি করে থাকেন। মাদুরের আগের মতো চাহিদা নেই। এছাড়া লাভও এখন খুবই কম।
বিসিক শিল্পনগরী সাতক্ষীরার উপ-ব্যবস্থাপক গৌরব দাস বাসসকে বলেন, বিসিক সাধারণত ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারী শিল্প উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করে। সাতক্ষীরার মাদুর শিল্পটি এক সময়ে অনেক নাম করা ছিল। মাদুর শিল্পকে আরো কিভাবে আধুনিকায়ন করা যায় এজন্য আমরা প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তার আওতায় আনতে পারি এবং এই মাদুর শিল্পের বাজার আরো কিভাবে সম্প্রসারণ করা যায় সে ব্যাপারে আমরা কাজ করছি।