বাসস
  ২৩ জুন ২০২৬, ১০:২৪

নিরাপদ খাদ্য বাজারজাত করতে হাবিপ্রবি’র গবেষকদের সাফল্য

॥ রুস্তম আলী মন্ডল ॥

দিনাজপুর, ২৩ জুন, ২০২৬ (বাসস): হাবিপ্রবি’র গবেষকরা নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণ গবেষণায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ এক সাফল্য অর্জন করেছেন।

দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-হাবিপ্রবি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এমন একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, যার মাধ্যমে মাত্র ৯০ মিনিটে খাদ্যবাহিত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ‘ব্যাসিলাস সেরিয়াস’ শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

গতকাল সোমবার রাতে দিনাজপুর হাবিপ্রবি জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. খাদেমুল ইসলাম এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাসস’কে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান,হাবিপ্রবি’র মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আতিকুল হকের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় লুপ-মেডিয়েটেড আইসোথার্মাল অ্যাম্পলিফিকেশন  প্রযুক্তিভিত্তিক এই পরীক্ষা পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, ডায়রিয়া ও খাদ্যে বিষক্রিয়ার মতো নানা রোগের জন্য দায়ী এই ব্যাকটেরিয়া। এটি দেশের খাদ্য শৃঙ্খলের জন্য একটি বড় হুমকি বলে গবেষক দল অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

গবেষণায় মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ নমুনায় অন্তত একটি টক্সিন জিনের উপস্থিতি রয়েছে। সবচেয়ে বেশি দূষণ পাওয়া গেছে পশু খাদ্যের মধ্যে।

এ ছাড়া দুধ ও ডিমেও উল্লেখ যোগ্য মাত্রায় এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, ‘ব্যাসিলাস সেরিয়াস’ বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবস্থায় পূর্বানুমানের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত রয়েছে।

গবেষকরা জানান, প্রচলিত পিসিআর পরীক্ষায় ফলাফল পেতে সাধারণত ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লাগে এবং ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়। বিপরীতে নতুন ল্যাম্প প্রযুক্তিতে মাত্র ৯০ মিনিটের মধ্যে এর সঠিক ফলাফল পাওয়া সম্ভব।

এমনকি সাধারণ ওয়াটার বাথ বা হিটিং ব্লক ব্যবহার করেই পরীক্ষাটি সফলভাবে সম্পন্ন করা যায়। পরীক্ষা প্রতি খরচ তুলনামূলকভাবে কম, যা প্রায় ২ দশমিক ৫ মার্কিন ডলার।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সংবেদনশীলতার দিক থেকে নতুন প্রযুক্তিটি প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় প্রায় ১০ হাজার গুণ বেশি কার্যকর। একই সঙ্গে এটি ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ ডায়াগনস্টিক সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করেছে।

ড. মো. আতিকুল হক বাসস’কে বলেন, ‘এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সাধারণত ৪০ মিনিটের মধ্যেই ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করা সম্ভব হয়। যা সর্বোচ্চ ৯০ মিনিটে নিশ্চিত সঠিক ফলাফল পাওয়া যায়। সীমিত সম্পদের পরিবেশে এটি সহজে ব্যবহার করা যাবে। ফলে জন-স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে গবেষক দল আশ্বস্ত করছেন।’

তিনি বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি এই প্রযুক্তি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় পরিচালিত গবেষণাটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নাল ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সেলুলার অ্যান্ড ইনফেকশন মাইক্রোবায়োলজি’তে প্রকাশিত হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের গবেষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন স্বীকৃতি পেয়েছে।

গবেষকদের মতে, সরকারি খাদ্য পরীক্ষাগার,ভেটেরিনারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, দুগ্ধ ও পোল্ট্রি শিল্প এমনকি মোবাইল আউটব্রেক তদন্ত দলগুলোর জন্যও প্রযুক্তিটি অত্যন্ত কার্যকর হবে।

ভবিষ্যতে দেশব্যাপী বৃহৎ পরিসরে নমুনা সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ গবেষণা পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এক পরীক্ষায় একাধিক টক্সিন জিন শনাক্তের সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে মাল্টিপ্লেক্স ল্যাম্প প্রযুক্তি উন্নয়নের কাজও চলবে। গবেষকরা মাঠপর্যায়ে সরাসরি ব্যবহারের উপযোগী বহনযোগ্য ফিল্ড কিট তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন।

তবে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে গবেষণাটি আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন গবেষক দলের সদস্যরা। তারা মনে করেন, প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পাওয়া গেলে দেশের আরও বেশি অঞ্চল ও খাদ্যপণ্যে এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। তবে এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে গবেষক দলকে গবেষণার কাজে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে গবেষণাটি আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলে, অধিক পরিমাণ ও বেশি নিরাপদ খাদ্য বাজারজাত করতে উপকৃত হতে পারবে বলে গবেষক দলের পক্ষ থেকে অবহিত করা হয়।