শিরোনাম

/ শফিকুল ইসলাম বেবু /
কুড়িগ্রাম, ২২ জুন ২০২৬ (বাসস): প্রতিনিয়ত নদী ভাঙন, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার চরবাসী আলাদা চর মন্ত্রণালয় চালুর দাবি জানাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা এই দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করছেন।
সম্প্রতি কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাইকেরছড়া ইউনিয়নের পাইকডাঙ্গা এলাকা দুধকুমার নদের ভাঙনে বিলীন হয়ে যেতে বসেছে। এই ভাঙন থেকে রক্ষার দাবিতে গত শনিবার (২০ জুন) মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে চরবাসী। এদিন দুপুরে দুধকুমার নদের তীরে তীব্র ভাঙনকবলিত এলাকায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে নদীভাঙনের শিকার স্থানীয় প্রায় পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ অংশ নেন।
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু দুধকুমার নদী নয়, কুড়িগ্রাম জেলার ১৬টি নদ-নদীর প্রায় ৩৬টি পয়েন্টে তীব্র ভাঙন চলছে। গত ১০ বছরে জেলায় লক্ষাধিক মানুষ তাদের বসতভিটা হারিয়ে ঠিকানা বদল করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকারি কোনো দপ্তরেই এই বাস্তুচ্যুত মানুষের সঠিক হিসাব নেই। এমনকি নতুন করে যারা নদীভাঙনের শিকার হচ্ছেন, তাদেরও কেউ খোঁজ রাখছে না।’
বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, পৃথিবীর বহু দেশে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সাথে সাথে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। অথচ আমাদের দেশে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, ন্যূনতম সরকারি সহায়তাও পান না। তাদের খোঁজখবরও কেউ রাখে না।"
চরের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও স্থায়ী অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘ ৩৬ বছর আন্দোলন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পেয়েছে । এতে তাদের জীবনমান উন্নত হয়েছে। দেশের চরাঞ্চলের কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এখন ‘চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।’
কুড়িগ্রাম জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বাসসকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবন এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে আবদ্ধ। প্রতিবছর নদী ভাঙনে হাজার হাজার পরিবার বসতভিটা, ফসলি জমি ও জীবিকার উৎস হারাচ্ছে। অথচ তাদের জন্য কোনো পৃথক মন্ত্রণালয় বা সমন্বিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেই। আমরা অবিলম্বে ‘চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠনের দাবি জানাচ্ছি।’
তিনি বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা প্রণয়ন করে দ্রুত ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। চরবাসীর উন্নয়ন কোনো দয়ার বিষয় নয়, এটি তাদের সাংবিধানিক অধিকার।
নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাইকেরছড়া ইউনিয়নের পাইকডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা ইয়াসিন আলী বলেন, ‘দুধকুমার নদী আমার তিন বিঘা জমি আর বসতবাড়ি গিলে খেয়েছে। এখন অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে আছি। সরকারিভাবে কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি। আমরা দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও স্থায়ী নদী শাসনে সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
ক্ষতিগ্রস্ত হালিমা বেগম বলেন, ‘বারবার ঘর ভেঙে অন্য জায়গায় যেতে হচ্ছে। সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। চরবাসীর জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় হলে আমাদের সমস্যাগুলো গুরুত্ব পাবে বলে বিশ্বাস করি।’
পাইকেরছড়া ইউনিয়নের পাটেশ্বরী গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম নদী ভাঙনে জমিজমা হারিয়ে এখন দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাসসের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘নদীভাঙনে জমি হারিয়ে এখন দিনমজুরি করি। আমাদের মতো ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে। শুধু ত্রাণ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না।’
ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুরি ইউনিয়নের উত্তর ঢলডাঙ্গা চরাঞ্চলের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, ‘আমরা ভোট দিই, কর দিই, কিন্তু দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও অবহেলিত থাকি। চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও পুনর্বাসনের বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করি।’
জেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, কুড়িগ্রামের নদী তীরবর্তী মানুষের নিত্যদিনের দু:খ দুর্দশা লাঘব করতে হলে সরকারকে তাদের জন্য পৃথক ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন করতে হবে। তাদের সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন আলাদা মন্ত্রণালয় এবং আলাদা বাজেট। এটি তাদের ভাগ্যোন্নয়নের চাবিকাঠি। তাই চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় এখন শুধু সময়ের দাবি। তারা এ ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সুদৃষ্টি কামনা করেন।