বাসস
  ০৯ জুন ২০২৬, ১৩:১৪

আনারসের পাতায় তৈরি পুষ্টি সমৃদ্ধ গো-খাদ্য সাইলেজ তৈরিতে সফল আসাদুজ্জামান

গবাদি পশুর খাদ্য  হিসেবে তৈরি হচ্ছে উচ্চ পুষ্টিমান ও সাশ্রয়ী মূল্যের পশুর খাদ্য সাইলেজ। ছবি: বাসস

/মহিউদ্দিন সুমন/

টাঙ্গাইল, ৯ জুন, ২০২৬ (বাসস) : টাঙ্গাইলের মধুপুরে আনারসের ফেলে দেয়া পাতা থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গবাদি পশুর খাদ্য হিসেব তৈরি হচ্ছে উচ্চ পুষ্টিমান ও সাশ্রয়ী মূল্যের সাইলেজ। আর এই সাইলেজ তৈরি করে সফলতা লাভ করেছেন সফল উদ্যোক্তা আসাদুজ্জামান।

টাঙ্গাইলের মধুপুরকে বলা হয় আনারসের রাজধানী। মধুপুরের আনারস যেমন সুস্বাদু, তেমনি দেশজুড়ে ব্যাপক সুনাম ছড়িয়েছে। কিন্তু সেই আনারসের ফেলে দেয়া পাতা ও গাছ থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গবাদি পশুর খাদ্য  হিসেবে তৈরি হচ্ছে উচ্চ পুষ্টিমান ও সাশ্রয়ী মূল্যের পশুর খাদ্য সাইলেজ। এটা মূলত মিক্সার মেশিনের মাধ্যমে তরল প্রোটিন ও দানাদার পুষ্টিমান সম্পন্ন পশুখাদ্য তৈরি করে বিক্রি করা হয়। এই পদ্ধতি একদিকে যেমন কৃষি বর্জ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে প্রান্তিক খামারিদের খাদ্যের খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সাহায্য করছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায, গবাদি পশুকে আনারসের পাতার তৈরি সাইলেজ খাওয়ালে গরুর দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষ সহায়তা করে। বিশেষ করে আনারসের পাতায় থাকা বিশেষ ফাইবার ও শর্করার কারণে দুগ্ধবতী গাভীর দুধ উৎপাদন দৈনিক প্রায় ২-৩ লিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং গরুরও শারীরিক বৃদ্ধি হয়। গাজন প্রক্রিয়ার ফলে পাতার শর্করা ল্যাকটিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়, যা গরুর হজমশক্তি বাড়াতে সহায়তা করে।

সরেজমিনে জেলার মধুপুর উপজেলার বীরবাইদ ইউনিয়নের চুনিয়া ফৈটামারি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গবাদি পশুর খাদ্য তৈরি করার জন্য আনারস পাতা সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। ওই পাতাগুলো একটি মেশিনের মাধ্যমে প্রসেসিং করা হচ্ছে। মেশিনের অপরপ্রান্তে প্রসেসিং করা আনারস পাতায় তৈরি সাইলেজ প্লাস্টিকের বস্তায় ভর্তি করা হচ্ছে। এ সময় এই প্রতিবেদনের সাথ কথা হয় এ প্রকল্পের উদ্যোক্তা আসাদুজ্জামান আসাদ এর সাথে।

এ সময় আসাদুজ্জামান আসাদ বাসস’কে জানান, ২০২৪ সালে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর এর আর্থিক সহায়তায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘এসএসএস’ এর সহযোগিতায় এ কাজে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই সংস্থা থেকেই অনুদান পাওয়া ৯ লাখ টাকা খরচ করে সাইলেজ তৈরির মেশিন ক্রয় করেন। এই মেশিনের মাধ্যমে আনারসের পাতা দিয়ে পশুর খাদ্য তৈরি কার্যক্রম শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি এ প্রদ্ধতিতে তৈরি খাবার বিভিন্ন খামারীদের কাছে বিক্রি করতে থাকেন। এখন সে প্রতিদিন ৬ টন করে সাইলেজ তৈরি করেন। বস্তায় ভরা অবস্থায় এ সাইলেজ ৬ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখা যায়। এ কাজে তার মোট আটজন কর্মচারী নিযুক্ত রয়েছে। তাদের প্রত্যেককে প্রতিদিন ৬শ’ টাকা করে বেতন দেয়া হয়।  তারা এ কাজে তাকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে। খরচ বাদে এখন তার মাসিক আয় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

উদ্যোক্তা আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, পাতার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে আনারসের পাতা কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করা হয়। পরে বিভিন্ন  প্রদ্ধতিতে মেশিনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদিত সাইলেজ গরু, মহিষ, ছাগলসহ অন্যান্য গবাদি পশুর খাদ্য তৈরি করা হয়। বর্তমানে বাজারের ভুট্টার সাইলেজ প্রতি কেজি ১৫-১৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেখানে আনারস পাতার সাইলেজ মাত্র ৫-৬ টাকা কেজিতে প্রান্তিক খামারিদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।

তিনি জানান, প্রথমদিকে যখন আনারসের ফেলে দেয়া পাতা ও গাছ থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গবাদি পশুর খাদ্য সাইলেজ তৈরি করি। তখন আমাকে সবাই পাগল হিসেবে আখ্যা দেয়। তখন মানুষের কথায় কোনো কান না দিয়ে ভাগ্যে বদলের আশায় নতুন প্রকল্পে মনোযোগ সহকারে কাজ চালিয়ে যাই। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তাকে দেখে এলাকার হুমায়ুন কবির ও আব্দুল আলিমসহ আরো অনেকে এ কাজে সম্পৃক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

তিনি আরো জানান, পশু খাদ্যে খড় ও ঘাসের চাহিদা পূরণ করে বিধায় সাইলেজের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এটা সারা বছরই উৎপাদন করা যায়। তার উৎপাদিত সাইলেজ বর্তমানে তিনি জেলার ভুয়াপুর উপজেলার গরুর খামারি শিহাব উদ্দিন প্রতি সপ্তাহে ১০ টন এবং মধুপুরের খামারি রেজাউল করিম সপ্তাহে ৬ টন এবং নাজমুল সাদাত নোমান ১২ টন সাইলেজ ৫/৬ টাকা কেজিতে নিয়মিত বিক্রি করছেন। এ ছাড়াও এ সাইলেজ ঢাকার সাভার, রংপুর, সিরাজগঞ্জ,দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন ফার্মে বিক্রি করছেন।

কর্মচারী মিঠুন মিয়া বলেন, এখানে আমরা প্রতিদিন ৬টন করে সাইলেজ তৈরি। আনারসের পাতা দিয়ে তৈরি গবাদি পশুর জন্য খাদ্যগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য যাচ্ছে। ১ টন খাদ্য তৈরি করতে আমাদের ২-৩ ঘণ্টা সময় লাগে।

ভুয়াপুর থেকে সাইলেজ কিনতে আসা গরুর খামারি শিহাব উদ্দিন জানান, গবাদিপশুর খাবার সাইলেজ কেনার জন্য আমি এখানে এসেছি। এখানে আনারসের পাতা দিয়ে তৈরি কম দামে মান সম্মত খাদ্য সাইলেজ পাওয়া যায়। আমি তাদের এ কার্যক্রম দেখে খুব খুশি। এ সাইলেজ আমার খামারের গরুকে নিয়মিত খাওয়াচ্ছি। এর ফলে আমার খামারের গরুর খাদ্যের ব্যয় অনেকাংশে কমে এসেছে।

তিনি মনে করেন,স্বল্পমূল্য আনারস পাতার তৈরি এই পশুখাদ্য এর ব্যবহার বহুগুণ বাড়ানো গেলে একদিকে কৃষকদের সাশ্রয় হয়, খামারিরাও স্বল্প মূল্যে গরু বিক্রি করতে পারে। এতে করে গরুর মাংসের দামও কমে আসবে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘এসএসএস’ -এর নির্বাহী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সন্তোষ চন্দ্র পাল বাসস’কে জানান, সংস্থাটি শুরু থেকেই জেলার মধুপুর গড় ও পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন নতুন কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে ক্ষুদ্র অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে আসছে।

তিনি আরো জানান, আমরা লক্ষ্য করেছি প্রতি বছর মধুপুরে হাজার হাজার টন আনারসের পাতা যত্রতত্রভাবে নষ্ট হয় । সেই ফেলে দেয়া আনারসের পাতা মেশিনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে পশুর গো খাদ্য হিসেবে সাইলেজ তৈরি করার লক্ষ্যে আমরা স্মার্ট এইচভিসি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এ প্রকল্পে ১ হাজর ৮শ’ সদস্যদের ক্ষুদ্র অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের উপকার ভোগীরা নতুন নতুন আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হেলাল উদ্দিন বাসস’কে জানান, গবাদি পশুর খাদ্য হিসাবে আনারস সাইলেজ অবশিষ্টাংশ পুষ্টিতে খুব সমৃদ্ধ। এ সাইলেজ গরুকে খাওয়ালে দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি হয়। 

অন্যদিকে আনারসের সজ্জাতে প্রচুর পরিমাণে সেলুলোজ থাকে, যা গবাদি পশু এবং ভেড়ার পরিপাকতন্ত্রকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া আনারসের অবশিষ্টাংশ অনেক প্রোটিনে সমৃদ্ধ, যা গবাদি পশুর বৃদ্ধি বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি পূরণ এবং প্রজনন দক্ষতা উন্নত করে।

তিনি আরো জানান, বাজারে যেখানে ভুট্টার সাইলেজ প্রতি কেজি ১৫-১৭ টাকা, সেখানে মধুপুরের আনারস পাতার সাইলেজ মাত্র ৫ থেকে ৬ টাকা কেজি। এটা খামারিদের খাবারের খরচ অনেকাংশে কমে আসবে। এই সাইলেজ প্রান্তিক খামারিদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য জেলার প্রতিটি উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।