বাসস
  ২৬ মে ২০২৬, ০৯:৫৪

খুলনায় মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি ; জমে উঠেছে ২৭ পশুর হাট

এবার মোট ২৭টি স্থায়ী ও অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট বসেছে। ছবি: বাসস

\ মুহাম্মদ নূরুজ্জামান \

খুলনা, ২৬ মে, ২০২৬ (বাসস) : দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আযহা। আর মাত্র দু’দিন বাকি। এটি বিশ্ব মুসলিমের দ্বিতীয় সর্ববৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব।

এদিকে, পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে খুলনা জেলা ও মহানগরী এলাকা মিলিয়ে এবার মোট ২৭টি স্থায়ী ও অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট বসেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এসব হাটে পশু বেচাকেনা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যেই এসব হাটে পশু বেচাকেনা জমে উঠেছে।

এদিকে, এবার হাটে মাঝারি আকারের দেশি গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘টাইট গরু’ কিনতেই বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে ক্রেতাদের মধ্যে। তবে এসব হাটে প্রচুর পশু আমদানি হলেও আশানুরূপ ক্রেতা না থাকায় কিছুটা হতাশ খামারিরা। তাদের দাবি, পশু খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাজারে কাঙ্খিত দাম মিলছে না। অন্যদিকে, ক্রেতারা বলছেন, পশুর তুলনায় দাম বেশি।

খুলনা জেলা ও মহানগরের প্রধান পশুর হাটগুলোর মধ্যে খুলনা সিটি করপোরেশন পরিচালিত মহানগরীর জোড়াগেট অন্যতম। এটি খুলনা মহানগরীর সর্ববৃহৎ ও প্রধান কোরবানির পশুর হাট। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ের প্রধান হাটগুলোর মধ্যে রয়েছে তেরখাদা হাট, ডুমুরিয়া সদর হাট, খর্ণিয়া, চুকনগর হাট ও গুটুদিয়া হাট, রূপসা উপজেলার ঘাটভোগ পশুর হাট ও রূপসা ফেরিঘাট সংলগ্ন হাট, ফুলতলা উপজেলার দামোদর হাট ও ফুলতলা বাজার হাট, বটিয়াঘাটা উপজেলা সদর ও কাতিয়ানালা পশুর হাট, দিঘলিয়া উপজেলা ও সেনহাটি পশুর হাট, পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি ও পাইকগাছা সদর হাট এবং কয়রা উপজেলা সদর ও আমাদি হাট। এর বাইরেও জেলার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে অস্থায়ী পশুর হাট বসেছে। পশুর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব হাটে প্রাণিসম্পদ বিভাগের মেডিকেল টিম এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা ও জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ চালু রয়েছে।

পাইকগাছা : জেলার পাইকগাছার চাঁদখালী পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়ে জমে উঠেছে কোরবানির পশু বেচাকেনা। হাটে বেড়েছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়। শেষ মুহূর্তে এসে উপজেলার চাঁদখালী, কাশিমনগর, গদাইপুর, আগড়ঘাটা, রাড়ুলীর শ্রীকণ্ঠপুর, বাঁকা বাজার ও ঈদগাহ মাঠের হাটগুলোতে জমে উঠেছে বেচাকেনা।

প্রতিদিন সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু ও ছাগল নিয়ে হাটে আসছেন খামারি, ব্যবসায়ী ও গৃহস্থরা। হাটজুড়ে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে পশু। দুপুরের পর বাড়ছে ক্রেতাদের উপস্থিতি। পছন্দের পশু ঘুরে ঘুরে দেখছেন ক্রেতারা, আর দরদাম নিয়েই চলছে জমজমাট আলোচনা।

গদাইপুর হাটের বিক্রেতারা জানান, মাঝারি আকারের দেশি গরুর চাহিদা এবার সবচেয়ে বেশি। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘টাইট গরু’ কিনতেই বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে ক্রেতাদের মধ্যে। এ হাটে ছোট গরু ৫৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে বড় গরু সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি আকারের গরুর দাম ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যে বেশি দেখা গেছে। অন্যদিকে ছাগল বিক্রি হচ্ছে ১৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকায়।

ব্যবসায়ী ফারুক গাজী বাসস’কে বলেন, গত বছর যে গরুর দাম এক লাখ টাকার ওপরে ছিল। এবার একই গরুর দাম ক্রেতারা তুলনামূলক কম বলছেন। ছাগলের বাজারেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। তবে ঈদের আগের শেষ কয়েকটি হাটে দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলে আশা করছেন তারা।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. পার্থ প্রতিম রায় বাসস’কে জানান, পাইকগাছার খামার ও গৃহস্থালিতে লালন-পালন করা গরুগুলো স্বাভাবিক খাবারে বড় করা হয়েছে। তারপরও ক্ষতিকর কিছু ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা যাচাইয়ে প্রতিটি হাটে মেডিকেল টিম কাজ করছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বাসস’কে বলেন, কোরবানির পশুর হাটগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি রয়েছে। কোনো ধরনের সমস্যা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডুমুরিয়া : খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার অন্যতম বৃহত্তম পশুহাট খর্নিয়া। হাটে এবারও দেশি জাতের ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর চাহিদা অনেক বেশি। বড় গরুর চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় দুশ্চিন্তায় আছে খামারি ও চাষিরা। ক্রেতারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার গরুর দাম কিছুটা বেশি।

গত বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক এই পশুহাট ঘুরে দেখা গেছে, হাটে হাজারেরও বেশি গরু, ছাগল, ভেড়া মহিষ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বেপারিরা কোরবানির পশু ক্রয়ের জন্য হাটে এসেছেন। বেপারিদের সঙ্গে খামারিদের গরু বেচাকেনা করতে দীর্ঘক্ষণ ধরে দর কষাকষি করতে দেখা গেছে। কোরবানির পশু ও ক্রেতা বিক্রেতাদের সমাগমে হাটটি বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে। হাটের বিশাল আকৃতির গরুগুলো সবার নজর কাড়লেও সাধারণ ক্রেতাদের মাঝারি সাইজের গরুতে আগ্রহ বেশি।

কোরবানির গরু কিনতে আসা মোনতাজ আলি জানান, কোরবানি দেয়ার জন্য হাটে একটি গরু কিনতে এসেছি। বাজারে গরুর দাম অনেক বেশি। একটু বড় সাইজের গরুগুলো দাম বলছে দুই লাখ টাকা। ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে মাঝারি সাইজের একটি গরু খুঁজছি। কিন্তু গরু পছন্দ হলেও দেড় লাখ টাকার নিচে দাম বলছে না।

খামারি রুহুল শেখ বলেন, ‘কোরবানির জন্য ফার্মে ১০টি গরু পালছিলাম। আজকে ৫টি গরু হাটে নিয়ে এসেছি। গরুর দাম শুনে অনেকই বলছে দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে। এখন গোখাদ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে। গরু লালন-পালন করতে অনেক খরচ হয়। সব কিছু হিসেব করে দাম চাওয়া হচ্ছে।

খুলনা থেকে গরু কিনতে আসা মোসলেম বেপারি বাসস’কে বলেন, ‘এই হাটে অনেক গরু আমদানি হয়। যার কারণে ট্রাক নিয়ে গুরু কিনতে এসেছি। ১০টি গরু কেনা হয়েছে। আর ৫টি গরু কিনে ঢাকায় নিয়ে যাব। মাঝারি সাইজের গরুর চাহিদা বেশি থাকার কারণে এই ধরনের গরু বেশি কেনা হয়েছে।’

কোরবানির ছাগল কিনতে আসা সুমন আহমেদ বলেন, হাটে কোরবানি দেয়ার উপযুক্ত প্রচুর ছাগল উঠেছে। ছাগলের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। ২০ হাজার টাকায় পছন্দমতো একটি ছাগল কিনতে পেরেছি।

ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. মো. আশরাফুল কবির বাসস’কে বলেন, ‘খর্ণিয়া পশুর হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতারা যাতে নির্বিঘ্নে সুস্থ-সবল পশু কেনাবেচা করতে পারেন, সেজন্য আমাদের প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে। হাটে আসা কোনো পশু অসুস্থ হয়ে পড়লে বা কারো কোনো পশুর স্বাস্থ্য নিয়ে সন্দেহ থাকলে আমাদের টিম তাৎক্ষণিক বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও পরামর্শ দিচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ক্ষতিকারক রাসায়নিক ও স্টেরয়েড মুক্ত পশু। এবার খামারিরা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে খড়, ঘাস ও দানাদার খাদ্য খাইয়ে পশু মোটাতাজা করেছেন। ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা হরমোন প্রয়োগ করে মোটাতাজাকরণ করা পশুর সরবরাহ রোধে প্রাণিসম্পদ বিভাগ কঠোর নজরদারি রাখছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বাসস’কে বলেন, ‘খর্ণিয়া পশুর হাট ডুমুরিয়ার অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী এবং বড় একটি হাট। এ হাটে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা ও বিক্রেতারা যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই নির্বিঘ্নে এবং নিরাপদ পরিবেশে বেচাকেনা করতে পারেন সেজন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।

দাকোপ : জেলার দাকোপ উপজেলা সদরের চালনা বাজার সাপ্তাহিক পশুর হাটে কোরবানির পশুর কেনাবেচা পুরোদমে জমে উঠেছে। উপজেলার সর্ববৃহৎ এই পশুর হাটে সকাল থেকেই পশুর ব্যাপক আমদানি লক্ষ্য করা গেছে।

সরেজমিনে চালনা বাজার পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত ও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে খামারি ও সাধারণ কৃষকরা তাদের লালন-পালন করা গরু হাটে নিয়ে এসেছেন। হাটে ছোট, মাঝারি ও বড় সাইজের শত শত গরুর সমাগম ঘটেছে। কোরবানি উপলক্ষে শুধু স্থানীয় ক্রেতাই নন, উপজেলার বাইরে থেকেও অনেক পাইকার ও সাধারণ ক্রেতা এসেছেন এই হাটে গরু কিনতে। তবে হাটে পশুর পর্যাপ্ত আমদানি ও ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও বেচাবিক্রি কিছুটা কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চালনা বাজার পশুর হাটের ইজারাদার হুমায়ুন গাজী বাসস’কে বলেন,‘পবিত্র কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে হাটে সকাল থেকেই প্রচুর গরুর আগমন ঘটেছে এবং সকাল থেকেই কেনাবেচা মোটামুটি ভালোই চলছে। রেকর্ড সংখ্যক কেনাবেচা হবে বলে আমরা আশাবাদী।’

এদিকে কেসিসি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ বাসস’কে জানিয়েছেন, খুলনার সবচেয়ে বড় পশুর হাট নগরীর জোড়াগেটে কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি নজরদারি, মেডিক্যাল টিম, আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন এবং জাল টাকা শনাক্তকরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে মেশিন স্থাপন করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে খুলনা বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পরিচালক ডা. মো. গোলাম হায়দার বাসস’কে বলেন, খুলনার জেলার ৯টি উপজেলাসহ কেসিসি’[র ভেতরেও গবাদি পশুর হাট স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও পশু স্বাস্থ্য 

ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পশু চিকিৎসক দল পশুর হাটে দায়িত্ব পালন করছে।