বাসস
  ২৫ মে ২০২৬, ১১:৪১
আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ১২:২০

ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথে বাংলাদেশ: বৈষম্যই বড় বাধা

ঢাকা, ২৫ মে, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করছে। এখনকার মূল চ্যালেঞ্জ মানুষকে মোবাইল ফোন সংযোগের আওতায় আনা নয়, বরং মানসম্মত ইন্টারনেট সুবিধা, ডিভাইসের মালিকানায় নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণ এবং দক্ষতার ভিত্তিতে ডিজিটাল অর্থনীতিতে সবার অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) প্রবেশাধিকার ও ব্যবহার সংক্রান্ত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেশের ডিজিটাল পরিমণ্ডলের একটি জটিল চিত্র ফুটে উঠেছে।
এতে দেখা যায়, মোবাইল সংযোগ এখন প্রায় সবার কাছে পৌঁছালেও উন্নত ডিজিটাল সম্পৃক্ততা অঞ্চল, লিঙ্গ এবং আয়ের ভিত্তিতে এখনও ব্যাপক অসমতা রয়ে গেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডিজিটাল বিভাজন এখন আর কেবল মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং কার কাছে উন্নত প্রযুক্তি রয়েছে, কে উন্নত ইন্টারনেট সুবিধা পাচ্ছেন এবং কে উৎপাদনশীল ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করতে পারছেন—তার ওপর ভিত্তি করেই এই বিভাজন তৈরি হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, জাতীয় পর্যায়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ প্রায় শতভাগে (৯৮ শতাংশের বেশি) পৌঁছেছে, যেখানে সিটি কর্পোরেশন এলাকাগুলোতে এই হার শতভাগ। তবে উন্নত ডিজিটাল সুবিধার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। যেখানে ৯৮.৩ শতাংশ পরিবারে মোবাইল ফোন রয়েছে, সেখানে কম্পিউটার রয়েছে মাত্র ৮.৯ শতাংশ পরিবারে। একইভাবে, ৭২.৮ শতাংশ পরিবারের স্মার্টফোন থাকলেও সচল ইন্টারনেট সুবিধা রয়েছে মাত্র ৫৫.১ শতাংশের।

এই বৈষম্যকে বিশ্লেষকরা ‘ভোগ-উৎপাদন বৈপরীত্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যেখানে অধিকাংশ নাগরিক মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে ডিজিটাল কনটেন্টে প্রবেশ করতে পারছে, কিন্তু সফটওয়্যার উন্নয়ন, অনলাইনে কাজ, ডিজিটাল উদ্যোক্তা কার্যক্রম বা পেশাগত উৎপাদনশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় টুলের অভাব রয়েছে।

তথ্য বলছে, এখন মৌলিক সংযোগের চেয়ে ডিজিটাল প্রবেশাধিকারের মান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জাতীয় পর্যায়ে অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ হলেও অঞ্চলভেদে প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো বড় রকমের অমিল রয়ে গেছে। বিশেষ করে স্মার্টফোন ব্যবহার, ইন্টারনেট সংযোগ এবং কম্পিউটারের প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে গ্রামীণ অঞ্চলের তুলনায় সিটি কর্পোরেশন এলাকাগুলো এখনো অনেকখানি এগিয়ে রয়েছে। এই ব্যবধান সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট ময়মনসিংহ, রংপুর ও ঢাকা বিভাগে।

ময়মনসিংহে স্মার্টফোন ব্যবহারে শহর ও গ্রামের পার্থক্য ১২ শতাংশ, ইন্টারনেট সংযোগে ১৫.৪ শতাংশ এবং কম্পিউটার মালিকানায় ১২.৬ শতাংশ। রংপুরেও একই ধরনের বড় ব্যবধান দেখা গেছে। অন্যদিকে, ঢাকা বিভাগে গ্রামীণ ও নগর জনগোষ্ঠীর মধ্যে কম্পিউটার মালিকানার ক্ষেত্রে রেকর্ড ২৩.৯ শতাংশ ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও উন্নত ডিজিটাল সক্ষমতা কেবল সীমিত সংখ্যক নগরবাসীর মধ্যেই কেন্দ্রীভূত রয়েছে। ফলে উচ্চমূল্যের ডিজিটাল কার্যক্রমে বৃহত্তর আঞ্চলিক অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ডিজিটাল সুবিধা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বড় বৈষম্যের চিত্রও এই উপাত্তে উঠে এসেছে। মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান কমলেও বেশ কিছু অঞ্চলে এর মালিকানার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের অমিল রয়ে গেছে। যেমন—চট্টগ্রাম বিভাগে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান শূন্যে নেমে এলেও স্মার্টফোন মালিকানার ক্ষেত্রে এখনো ৬.৫ শতাংশ ব্যবধান রয়ে গেছে।

ইন্টারনেট ব্যবহারের তথ্যেও এই বিভাজন স্পষ্ট। ঢাকা বিভাগে পুরুষদের ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৭৫ শতাংশ, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৬.৫ শতাংশ। খুলনা বিভাগে পুরুষদের ৭৩.৫ শতাংশের বিপরীতে নারীদের হার ৬০.১ শতাংশ। আর চট্টগ্রাম বিভাগে পুরুষদের ৬৮.৩ শতাংশের বিপরীতে নারীদের ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৬৪.০ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে, অনেক নারী এখনও ব্যক্তিগত স্মার্টফোন ব্যবহারের চেয়ে পরিবারের যৌথ ডিভাইসের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত ডিভাইসের এই অভাব নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পিন নম্বর গোপন রাখা, নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং নিজস্ব ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি।

স্মার্টফোন মালিকানার ক্ষেত্রে এই লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে রংপুর বিভাগে। সেখানে নারী ও পুরুষের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারের ব্যবধান সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ।

জেলা পর্যায়ের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাতীয় গড় হিসাবের আড়ালে তীব্র আঞ্চলিক বৈষম্য লুকিয়ে রয়েছে। স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের ব্যবহারের দিক থেকে ঢাকা, গাজীপুর ও ফেনী জেলা ধারাবাহিকভাবে দেশের শীর্ষস্থানে রয়েছে।

বিপরীতে পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম ও নড়াইল জেলা রয়েছে সবচেয়ে তলানিতে। বিশেষ করে পঞ্চগড় জেলায় উন্নত ডিজিটাল এক্সক্লুশনের চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ। সেখানে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ কম।

এ তথ্য ইঙ্গিত করে, একমুখী জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) নীতি দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের এই বৈষম্যগুলো দূর করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যেসব জেলা ডিজিটাল উন্নয়নের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

পরিসংখ্যানে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা হয়েছে—ডিজিটাল মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, ডিভাইস ও ইন্টারনেটের উচ্চ মূল্য এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ।

এ বিষয়ে টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বাসসকে বলেন, শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে মোবাইল এবং ফিক্সড ব্রডব্যান্ড, উভয় ধরনের ইন্টারনেটের অনুপস্থিতিই এই ধীরগতির ডিজিটাল প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

তিনি বলেন, দেশজুড়ে ৪জি মোবাইল ব্রডব্যান্ড সেবা নিশ্চিত করা গেলে গ্রামীণ ব্যবহারকারীরা নিজস্ব ডিভাইসে ইন্টারনেট ব্যবহারে আরও বেশি আগ্রহী হবেন। তবে বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশের কারণে মোবাইল অপারেটররা সব এলাকায় পূর্ণাঙ্গ ৪জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে এখনও দ্বিধাবোধ করছে।

সুমন আহমেদ সাবির স্মার্টফোনের উচ্চমূল্যকেও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। গ্রামীণ অঞ্চলের কম আয়ের মানুষের কাছে ডিভাইসগুলো সাশ্রয়ী করতে তিনি সরকারি নীতিগত সহায়তার আহ্বান জানান।

এছাড়া আরও বেশি নাগরিককে ইন্টারনেট ব্যবহারে উৎসাহিত করতে ডিজিটাল ভূমিসেবার মতো অন্যান্য অনলাইন সরকারি সেবা সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সারাদেশে ইন্টারনেটের প্রসার বাড়াতে ফিক্সড ব্রডব্যান্ড অবকাঠামোর পাশাপাশি ৪জি কাভারেজ বাড়ানো এবং সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন নিশ্চিত করা একটি ব্যবহারিক ও কার্যকর উপায় হবে।

গবেষণার সার্বিক তথ্য ইঙ্গিত করে, বাংলাদেশের ডিজিটাল বিভাজন এখন আরও জটিল রূপ নিচ্ছে; যেখানে মৌলিক সংযোগ বা এক্সেস সর্বজনীন হলেও অর্থপূর্ণ ডিজিটাল ক্ষমতায়ন অসমই রয়ে গেছে।

শিল্প পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ডিজিটাল সুফল যেন কেবল নির্দিষ্ট কিছু শহর বা আর্থ-সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে এটিই হবে দেশের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ। এটিকে ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, আঞ্চলিক অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক ক্ষমতায়নে রূপান্তর করাই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।