বাসস
  ১২ মে ২০২৬, ১৭:১৩

কুমিল্লায় কোরবানির পশু চাহিদার চেয়ে বেশি, প্রস্তুত ২ লাখ ৫৯ হাজার পশু

ছবি: বাসস

দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ

কুমিল্লা, ১২ মে, ২০২৬ (বাসস) : আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কুমিল্লা জেলায় কোরবানির পশুর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। জেলার ১৭টি উপজেলায় খামার ও পারিবারিক পর্যায়ে লালন-পালন করা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার গবাদিপশু। এর বিপরীতে জেলার সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার পশু। এতে চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত প্রায় ১২ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় খামারিদের উৎপাদিত পশু দিয়েই এবার জেলার কোরবানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি উদ্বৃত্ত পশু দেশের অন্যান্য জেলাতেও সরবরাহ করা যাবে। ঈদকে কেন্দ্র করে জেলার বিভিন্ন খামারে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা ও বিক্রির প্রস্তুতি।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশুর মধ্যে গরু ও মহিষ রয়েছে ২ লাখ ৭১৭টি। এছাড়া ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য প্রাণী রয়েছে ৫৮ হাজার ২৮৩টি। জেলার অধিকাংশ খামারেই দেশীয় পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক খাদ্য ব্যবহার করে পশু মোটাতাজা করা হয়েছে।

উপজেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে, আদর্শ সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ২০ হাজার ৯২৩টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়া বুড়িচং উপজেলায় ১৮ হাজার ৭৯৪টি, বরুড়ায় ১৭ হাজার ৬৪৭টি, চৌদ্দগ্রামে ১৬ হাজার ৯০৮টি এবং সদর দক্ষিণ উপজেলায় ১৪ হাজার ৫১৭টি পশু প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে সবচেয়ে কম পশু প্রস্তুত হয়েছে মেঘনা উপজেলায়। সেখানে প্রস্তুত পশুর সংখ্যা ৮ হাজার ৭৩২টি। তবে স্থানীয় চাহিদার তুলনায় এ সংখ্যাও পর্যাপ্ত বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

জেলার বিভিন্ন খামারে এখন ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করেছে। অনেকেই আগাম খামারে গিয়ে পছন্দের পশু কিনে বুকিং দিয়ে রাখছেন। খামারিরাও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে গরুগুলোর ভিন্নধর্মী নামকরণ করেছেন।

কুমিল্লা নগরীর কালিয়াজুড়ি এলাকার নূর জাহান এগ্রো ফার্মের মালিক খামারি মো. মনির হোসেন জানান, তার খামারে এবার ৭২টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছে। বিভিন্ন আকার ও জাতের এসব গরুর মধ্যে রয়েছে ব্রাহমা, সাইওয়ালসহ উন্নত জাতের গরু। খামারের গরুগুলোর নাম রাখা হয়েছে বাহুবলী, তুফান, ফাইটার, মামা-ভাগিনা ও এলবুনুর মতো আকর্ষণীয় নামে।

তিনি বলেন, ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতারা এখন নিয়মিত খামারে আসছেন। অনেকে দরদাম করছেন, আবার অনেকে আগাম কিনেও রেখে যাচ্ছেন। যারা আগে কিনে রাখছেন, তাদের গরু ঈদের আগে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে। আমাদের খামারে ৭০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা মূল্যের গরুও রয়েছে।

কুমিল্লা সদর উপজেলার বানাসোয়া এলাকার খামারি জামাল হোসেন জানান, তার খামারে ছোট বড় মিলিয়ে ১০৪টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে থাকা গরুর সংখ্যাই বেশি।

তিনি বলেন, এবার পশুর খাবারের দাম কিছুটা বাড়লেও গরুর বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। এখন ক্রেতারা খামারে এসে দেখে যাচ্ছেন। কেউ কেউ অগ্রিম বুকিংও দিচ্ছেন। আশা করছি, শেষ সময়ে বেচাকেনা আরও বাড়বে।

সদর দক্ষিণ উপজেলার বাগমারা এলাকার খামারি আব্দুল মমিন মিয়া বলেন, অনেক খামারি এখন আধুনিক পদ্ধতিতে গরু পালন করছেন। সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পাওয়ায় খামারিরা লাভবান হচ্ছেন। এবার দেশীয়ভাবে উৎপাদিত গরুর চাহিদা বেশি থাকবে বলে আশা করছি।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সামছুল আলম বলেন, কুমিল্লায় এ বছর কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না। খামারিদের উৎসাহ, সরকারি সহযোগিতা এবং নিয়মিত তদারকির কারণে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পশু উৎপাদন বেড়েছে। স্থানীয় খামারিরা এবার ভালো সাড়া পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, পশুর হাটগুলোতে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম দায়িত্ব পালন করবে। অসুস্থ কিংবা ক্ষতিকর উপায়ে মোটাতাজাকৃত পশু যাতে বাজারে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে। একই সঙ্গে ক্রেতাদের সচেতন করতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

এদিকে ঈদকে সামনে রেখে সীমান্ত এলাকায় নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। কুমিল্লা ১০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ জানান, জেলার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় গরু পাচারের তেমন প্রবণতা না থাকলেও ঈদ উপলক্ষে নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সীমান্ত এলাকায় টহল বাড়ানো হয়েছে। যাতে অবৈধভাবে বিদেশি পশু দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলার খামারিরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও বাণিজ্যিকভাবে পশু পালন করছেন। ফলে কুমিল্লা ধীরে ধীরে কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ জেলার তালিকায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে।