বাসস
  ১২ মে ২০২৬, ১৬:৩৮

দীর্ঘ অবহেলার পর আধুনিক কমপ্লেক্স হচ্ছে ‘শহীদ জিয়া হল’

নারায়ণগঞ্জ জেলার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ চাষাঢ়ার ‘শহীদ জিয়া হল’। ছবি: বাসস

নুসরাত সুপ্তি

নারায়ণগঞ্জ, ১২ মে, ২০২৬ (বাসস) : জেলার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ চাষাঢ়ার ‘শহীদ জিয়া হল’। এক সময় যা ছিল জেলার প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, আজ তা কেবলই এক জরাজীর্ণ কঙ্কাল। সংস্কারের অভাব, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর অযত্নে প্রায় দুই দশক ধরে পড়ে থাকা এ স্থাপনাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে পড়ে রয়েছে। তবে সম্প্রতি এ হলটি পুনর্নির্মাণ করে একটি আধুনিক কমপ্লেক্স গড়ার তোড়জোড় শুরু হওয়ায় নতুন করে আশার আলো দেখছেন নগরবাসী।

নারায়ণগঞ্জে একটি স্থায়ী মিলনায়তনের দাবি উঠেছিল সেই ১৯৫৬ সালে। কিন্তু তখন তা আলোর মুখ দেখেনি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়। ১৯৭৭ সালের ৮ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নারায়ণগঞ্জে এলে স্থানীয়দের দাবির মুখে চাষাঢ়া বালুর মাঠে টাউন হল নির্মাণের ঘোষণা দেন। ১৯৭৮ সালের ১০ মার্চ টাউন হলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার এটি ‘শহীদ জিয়া হল’ নামে নামকরণ করে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আওয়ামী লীগের টানা শাসনামলে হলটি দুই দশক ধরে চরম উপেক্ষিত ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তন’ হিসেবে ব্যবহার করলেও তা সাধারণ সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। ২০০৮ সালের পর থেকে এর দুর্দশা চরমে পৌঁছায়। হলটিতে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় আওয়ামী সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

সবশেষ ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল রাতে হলটির ছাদে অবস্থিত জিয়াউর রহমানের ম্যুরালটি দুর্বৃত্তরা ভেঙে ফেলে। অভিযোগের আঙুল ওঠে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের দিকে।

সরেজমিনে হলের ভেতরে ঢুকে দেখা মিলে গা ছমছমে পরিবেশের। মঞ্চ ও দর্শকদের বসার চেয়ারগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, ছাদ থেকে পানি পড়ে জন্মেছে শ্যাওলা। ভবনের ফাটল দিয়ে বেড়ে ওঠা বটগাছের শিকড় পুরো কাঠামোকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে। পরিত্যাক্ত হওয়ার পর মাদকসেবী ও চোরেরা এর দরজা-জানালা এমনকি গ্রিল পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর এবার হলটি নিয়ে নতুন পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এটি পুনর্নির্মাণের লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। 

তিনি বলেন, ‘শহীদ জিয়া হল’টি কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের স্মারক। বর্তমানে দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনটি জরাজীর্ণ ও ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো সময় এটি ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বলেন, ‘শহীদ জিয়া হল’ আধুনিক কমপ্লেক্সে রুপান্তর করা হলে নারায়ণগঞ্জবাসী একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক ও বিনোদন কেন্দ্র পাবে। এতে নতুন প্রজন্ম ইতিহাস সংস্কৃতি ও আদর্শের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম জিয়া হল প্রসঙ্গে বলেন, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্যদের ডিও লেটারের ভিত্তিতে আমরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। এখানে একটি অত্যাধুনিক হলরুম নির্মাণে আমাদের পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে।

নারায়ণগঞ্জ জেলার সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রত্যাশা, তাদের প্রিয় এই সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণ প্রাণ ফিরে পাবে। 

নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক কর্মী শাহীন মাহমুদ এ বিষয়ে বাসস’কে বলেন, এক সময় জিয়া হলে অনেক সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম হতো। জিয়া হল পরিত্যাক্ত ঘোষণার পর এখন আমাদের প্রোগ্রাম করতে হয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। আমরা প্রত্যাশা করব, এই হল আবারো তার দৃষ্টিনন্দিত রূপে প্রাণ ফিরে পাবে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বাসস’কে বলেন, ‘শহীদ জিয়া হল’ প্রথমত, আমাদের জন্য একটি আবেগের স্থান। এছাড়াও এটাকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জবাসীর মধ্যে রয়েছে ব্যাপক প্রত্যাশা। শীগ্রই শহীদ জিয়া হলের পুননির্মাণ করা হবে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম বাসস’কে বলেন, আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘শহীদ জিয়া হল’ পুনর্নির্মাণের অঙ্গীকার ছিল। আমরা এটিকে কেবল অডিটোরিয়াম নয়, বরং একটি বহুতল বিশিষ্ট আধুনিক কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তুলব। এখানে সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের পাশাপাশি বিবিধ নাগরিক সুবিধা থাকবে।