শিরোনাম

/আল-আমিন শাহরিয়ার/
ভোলা, ৩১ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): মৎস্য অভয়ারণ্যখ্যাত উপকূলীয় জেলা ভোলা ও তৎসংলগ্ন নদ-নদীতে এবার বড় সাইজের রুপালি ইলিশে সয়লাব। মৌসুমের সঠিক সময়ে সাগর থেকে নদীতে ছুটে আসছে চোখ জুড়ানো ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশের সারি। গত দুই সপ্তাহ ধরে জেলেরা তাদের জালে বড় ও মাঝারি সাইজের অসংখ্য ইলিশ পেয়ে আনন্দে আত্মহারা।
অধিক পরিমাণ ইলিশ আহরণের পর দেশের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ইলিশ এখন বিদেশে রপ্তানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন উপকূলের মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে জেলার মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবাদর, বেতুয়া, বুড়াগৌরঙ্গা আর ইলিশা নদীতে ইলিশ আহরণে জেলেদের ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে।
উপকূলীয় জেলেদের ব্যস্ততা এখন চোখে পড়ার মতো। জেলার বিভিন্ন নদী এলাকার জেলে, আড়ৎদার, ক্রেতা ও খুচরা মাছ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা হলে তারা ইলিশ প্রাপ্তিতে নিজেদের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন।
ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা মাছঘাট আড়ৎ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদশা মিয়া বাসসকে বলেন, গত চার সপ্তাহ ধরে জেলেদের জালে ধরা পড়া ইলিশের আকার ছিল একেবারেই ছোট। তাদের জালে ২শ’ থেকে ৭শ’ গ্রামের ইলিশ ধরা পড়তো। দামও ছিল চড়া। ফলে দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের ইলিশের দেখা না মেলায় আমরা মোকামে ইলিশ পাঠাতে পারতাম না। তবে সপ্তাহখানেক ধরে নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে বড় সাইজের ইলিশ। তাই এবার স্থানীয় ও দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি ইলিশ আমরা বিদেশে রপ্তানির চিন্তা করছি।
একই ঘাটের আড়ৎদার আবু বকর ও মোফাজ্জল মাঝি বলেন, সপ্তাহখানেক ধরে নদীতে জেলেদের জালে বড় সাইজের রাজা ইলিশের ছড়াছড়িতে ঘাটগুলোতে বেচাকেনার ধুম লেগেছে। ইলিশের প্রচুর আমদানিতে সাধারণ ক্রেতারাও নিজেদের সাধ্যের মধ্যে ইলিশ কিনে নিতে পারছেন।
জেলেরা জানান, সাগর থেকে নদীতে ইলিশের আগমন ও আহরণ বেশি হওয়ায় আগের চেয়ে দাম অনেকটাই কমে গেছে। তারা জানান, কয়েকদিন আগেও ৫শ’ গ্রাম সাইজের যে ইলিশ বিক্রি হতো ৬শ’ টাকা, এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৩শ’ টাকা। ৮শ’ গ্রাম সাইজের ইলিশের মূল্য ছিল ১১শ’ টাকা, তা এখন বিক্রি হচ্ছে, ৭ শ’ টাকায়।
ভোলার তুলাতুলি মেঘনা নদী পাড়ের জেলে আবু ফরাজী আব্দুল্লাহ মাঝি ও নাইমুদ্দিন মাঝি জানান, গতকাল রোববার দিবাগত সোমবার রাতভর নদীতে জাল ফেলে তারা বড় আকারের প্রায় ৩৬ কেজি ইলিশ মাছ পেয়েছেন। আড়তে নিয়ে বড় সাইজেরগুলো বিক্রি করে ছোটগুলো খাবারের জন্য বাড়িতে নিয়ে গেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার সাগর মোহনার জনপদ মনপুরা উপজেলার মেঘনা নদীতে জেলের জালে অহরহ ধরা পড়ছে আড়াই থেকে সাড়ে ৩ কেজি ওজনের ইলিশ।
গতকাল রোববার মনপুরার মেঘনা নদীতে ধরাপড়া দুটি রাজা ইলিশ নিলামে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
সেখানকার মৎস্য ব্যবসায়ী আমির হোসেন মাঝি জানান, গতকাল বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার ৫নম্বর কলাতলী ইউনিয়নের ঢালচর মৎস্যঘাটে মো. শরীফ ব্যাপারির মৎস্য আড়তে দুটি রাজা ইলিশ মাছ নিয়ে আসেন জেলে রফিক মাঝি। পরে নিলামে মাছ দুটি ১৫ হাজার টাকায় কিনে নেন মৎস্য ব্যবসায়ী ফরহাদ হাওলাদার।
জেলে রফিক মাঝি বলেন, রোববার মেঘনায় জাল ফেলে মাছ ধরার সময় অন্যান্য ছোট মাছের সঙ্গে বড় আকৃতির এ দুটি ইলিশ ধরা পড়ে। পরে মাছ দুটি আলাদা করে আড়তে নিয়ে নিলামে বিক্রি করা হয়।
মৎস্য ব্যবসায়ী মো. শাহাবুদ্দিন তালুকদার বলেন, নিলামে কয়েকজন ব্যবসায়ী অংশ নেন। পরে ফরহাদ হাওলাদারের আড়তের কর্মচারী মাছ দুটি কিনে নেন।
জেলার সাগর পাড়ের উপজেলা চরফ্যাশনের সামরাজ মৎস্য বন্দরেও এখন রাজা ইলিশের সমারোহ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন, সেখানকার জেলে ও আড়ৎদাররা। ওই বন্দরের আড়ৎদার মো.ঈমাম হোসেন পাটওয়ারী বাসসকে বলেন, বড় সাইজের ইলিশ পাওয়ায় সেখানে কেনা-বেচায় সরগরম চলছে। ফলে প্রতিদিন ওই বন্দর থেকে রাজধানী ঢাকা ও বন্দর নগরী চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী প্রায় শতকোটি টাকার ইলিশ বেচা-কেনা হয়ে থাকে।
তিনি বলেন, গত কয়েকদিন যেভাবে বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়ছে; এতে করে আমাদের নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি ইলিশ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সেখানকার মৎস্য আড়ৎদাররা।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী এবার মৌসুমে জেলায় ইলিশ আহরণ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার থেকে ১ লাখ ৯২ হাজার মেট্রিক টন।
মৎস্য সংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ লাখ ৭১ হাজার। এছাড়াও অনিবন্ধিত আরও ২ লাখের বেশি জেলে রয়েছেন।
মনপুরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বাসসকে বলেন, কিছুদিন আগেও মেঘনায় ইলিশের সংকট ছিল। এখন বড় আকৃতির ইলিশ জেলের জালে ধরা পড়া স্বস্তির বিষয়। সামনে আরও বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বাসসকে বলেন, মেঘনা-তেঁতুলিয়া ও জেলার শাখা নদীগুলোতে ইলিশ সংরক্ষণে পরিচালিত অভিযানের সুফল পাওয়া যাচ্ছে। নদীতে বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়ছে। জেলেরা নিষেধাজ্ঞা মেনে আরও সচেতন হলে ইলিশের উৎপাদন ও আকারÑদুটিই বাড়বে।
মৎস্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মেঘনা মোহনা দেশের অন্যতম প্রধান ইলিশ আহরণ এলাকা। নদীর পরিবেশ ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে আরও বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এসব ইলিশ দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে ইলিশ সম্পদে সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, উপকূলীয় জেলা ভোলার মেঘনা নদীর চর ইলিশা থেকে চর পিয়াল পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার জুড়ে মৎস্য অভয়ারণ্য বিস্তৃত। এছাড়া তেঁতুলিয়া নদী এলাকায়ও ভোলার মৎস্য অভয়ারণ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য বিভাগ।