শিরোনাম

ঢাকা, ৮ জুন, ২০২৬ (বাসস) : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশি সদস্যদের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেছেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সংঘাতপূর্ণ জনপদে মানবতার দূত হিসেবে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা বিশ্বজুড়ে অনন্য মর্যাদা অর্জন করেছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ভালোবেসে ও দেশের সম্মান রক্ষায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা, মানবিকতা এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবস্থান আজ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।
সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ডিফেন্স জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিজাব) আয়োজিত ‘বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবদান’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিজাব সভাপতি আলমগীর হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং সামিট পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মনিরুল ইসলাম আখন্দ, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কমোডর (অব.) এম এম জসিম উদ্দিন ভুঁইয়া ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এয়ার কমোডর মোহাম্মদ মুশতাকুর রহমান (এলপিআর)। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডিজাবের সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলাম মাসুম।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা শুধু সংঘাত নিরসনেই নয়, মানবিক সহায়তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন। তাদের অবদান আন্তর্জাতিক পরিম-লে দেশের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে।
তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশি ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সদস্যদের আন্তরিক অভিনন্দন জানান।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুমুখী পররাষ্ট্র নীতির ভিত রচনা করেছিলেন। জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি সংলাপ ও সহযোগিতার এক দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছিল। পরবর্তী সময়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রজ্ঞাবান ও দৃঢ় নেতৃত্বে সেই ভিত্তি আরো সুসংহত, বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা নতুন মাত্রা পায়।
তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা শক্তির রাজনীতির পরিবর্তে সহযোগিতার সংস্কৃতি, সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপের পথ এবং আধিপত্যের পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও অংশীদারিত্বের দর্শনকে সমুন্নত রাখার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
শামা ওবায়েদ বলেন, আমরা বিশ্বাস করি টেকসই শান্তির ভিত্তি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, ন্যায়বিচার ও মানবিক সংহতির বন্ধনে নির্মিত হয়। বর্তমানে সরকার আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের সক্রিয় সম্পৃক্ততাকে দেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র, যার জন্ম হয়েছিল অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ, অদম্য সংগ্রাম এবং রক্তস্রোতের মধ্যে দিয়ে। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমি গভীরভাবে অনুভব করি, ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকে। এই যুদ্ধ আমাদের শুধু একটি স্বাধীন ভূখণ্ড উপহার দেয়নি, বরং এটি আমাদের শান্তি, মানবতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শিখিয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা আমাদের অন্যতম কার্যকর সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করছেন। এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষী বিভিন্ন মিশনে নিষ্ঠা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের অবদান শুধু বাংলাদেশের জন্য গৌরবের নয়, বরং শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে নারীর সক্ষমতা ও নেতৃত্বে কার্যকর অংশগ্রহণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ আরো সম্প্রসারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শান্তির রক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুধু আমাদের আন্তর্জাতিক মর্যাদায় বৃদ্ধি করেনি, বরং জাতীয় সক্ষমতা বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, ১৯৮৮ সালে মাত্র ১৫ জন সামরিক পর্যবেক্ষক দিয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে দেশটি শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম শীর্ষ অবদান রাখা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪৩টি দেশে ৬৩টিরও বেশি মিশনে দুই লাখ ছয় হাজারের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি জানান, বর্তমানে জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের ৪ হাজার ২১২ জন সদস্য কর্মরত রয়েছেন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পথে আত্মত্যাগের অনন্য নজির স্থাপন করে এ পর্যন্ত ১৭৫ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জীবন উৎসর্গ করেছেন।
ডিফেন্স জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিজাব) সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, অনেকের ধারণা রয়েছে, শান্তিরক্ষা মিশনে গেলে শান্তিরক্ষী সদস্যরা বিপুল পরিমাণ অর্থ পান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই অর্থের বড় একটি অংশই বাংলাদেশ সরকার পেয়ে থাকে।