বাসস
  ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২১
আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২৬

দেশে শতাব্দীপ্রাচীন সহাবস্থানের বার্তা দেবে বুদ্ধপূর্ণিমা

প্রদ্যোৎ শ্রী বড়ুয়া ও জিতেন বড়ুয়া

ঢাকা, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : আগামী ১ মে উদযাপিত হতে যাওয়া বুদ্ধপূর্ণিমাকে ঘিরে প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়। তাদের সবচেয়ে বড় এ ধর্মীয় উৎসবটি দেশে শতাব্দীব্যাপী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

বুদ্ধপূর্ণিমা বৌদ্ধ ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলা বছরের প্রথম মাসের প্রথম পূর্ণিমা বা ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’তে গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বোধিলাভ ও মহাপরিনির্বাণ স্মরণে দিনটি পালন করা হয়। জাতিসংঘ ২০০০ সালে এ দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক বেসাক দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও বৌদ্ধ নেতা অধ্যাপক ড. দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বড়ুয়া বলেন, ‘আমরা কখনো নিজেদের অন্যদের থেকে আলাদা মনে করিনি। মুসলিম, হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আমাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিষয়টিকে বুদ্ধপূর্ণিমা আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরে।’

তিনি বলেন, বুদ্ধপূর্ণিমা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব হলেও এটি সর্বজনীন। আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির চেতনাকে সামনে রেখে সবাই এ উৎসবে অংশ নিতে পারেন।

একই বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সুমঙ্গল বড়ুয়া বলেন, বাংলাদেশের দীর্ঘ বৌদ্ধ ঐতিহ্য সম্প্রদায়টির অন্তর্ভুক্তি ও সহনশীলতার বোধকে শক্তিশালী করেছে।

ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকেই গৌতম বুদ্ধের জীবদ্দশায় প্রাচীন বাংলায় বৌদ্ধধর্মের প্রবেশ ঘটে। এরপর থেকে বৌদ্ধ সংস্কৃতি অন্যান্য ধর্মাবলম্বী, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে যায়।

বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বসবাস করলেও কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, সিলেট ও কুমিল্লা অঞ্চলে তাদের জনঘনত্ব বেশি।

বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সদস্যরা দিনটি বিশেষ প্রার্থনা, নানা ধর্মীয় আচার এবং বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে উদযাপন করেন।

কক্সবাজারের বিলছড়ি গ্রামের বাসিন্দা যশোদা বড়ুয়া বলেন, ‘এই উৎসব একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক ও সামষ্টিক।’

পঞ্চাশোর্ধ্ব যশোদা বড়ুয়া বলেন, শৈশব থেকেই তিনি দেখেছেন প্রতিবেশী মুসলিম পরিবারগুলোর সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে উৎসবটি আনন্দঘন পরিবেশে পালিত হয়ে আসছে।

তিনি বলেন, ‘উৎসব ঘিরে কখনো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আমাদের প্রতিবেশীরা সব সময় আমাদের আনন্দের অংশ হয়ে থাকেন।’

বাংলাদেশে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার, কুমিল্লার ময়নামতি ও বগুড়ার মহাস্থানগড়। এগুলো সমৃদ্ধ বৌদ্ধ সভ্যতার ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে।

বিশিষ্ট বৌদ্ধ ভিক্ষু প্রজ্ঞালংকার মহাথেরো বলেন, অহিংসা, সাম্য ও সহমর্মিতাই বৌদ্ধ শিক্ষার মূল ভিত্তি।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান অস্থির বিশ্বে বুদ্ধের দর্শন সংঘাত প্রতিরোধ এবং শান্তি ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়ক হতে পারে।’

খাগড়াছড়ি পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী এ ধর্মীয় নেতা বলেন, বাংলাদেশের বৌদ্ধরা পাহাড় ও সমতল উভয় অঞ্চলে শিক্ষা, ব্যবসা ও সরকারি সেবাসহ নানা ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে সহাবস্থানকে দৃশ্যমান করেছেন।

অধ্যাপক সুমঙ্গল বড়ুয়া বলেন, ‘এই অংশগ্রহণ বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ রাষ্ট্রগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও তারা অবদান রেখেছেন।’

খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, অহিংসার বৌদ্ধ আদর্শ ধারণ করা গেলে পার্বত্য অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আরও জোরদার হবে।

তিনি বলেন, ‘এসব মূল্যবোধ ধারণের মাধ্যমে আমরা এমন একটি শান্তিপূর্ণ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারব, যেখানে সব সম্প্রদায় মর্যাদার সঙ্গে সহাবস্থান করবে।’

স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া আশা প্রকাশ করে বলেন, এ বছরের বুদ্ধপূর্ণিমা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উদযাপিত হবে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে আরও উজ্জ্বল করবে।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে পবিত্র উৎসব হিসেবে বুদ্ধপূর্ণিমা উদযাপিত হয়। একই সঙ্গে ২০০০ সালে জাতিসংঘ দিনটিকে আন্তর্জাতিক বেসাক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।