বাসস
  ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:২৩
আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:২৭

যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে ইসলামাবাদে মার্কিন-ইরান বৈঠক

ঢাকা, ১১ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে শনিবার ইসলামাবাদ পৌঁছেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। 

এই আলোচনাকে আয়োজক দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ‘হয় এসপার, নয় ওসপার’ (মেক অর ব্রেক) পর্যায়ের এক প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

এদিকে ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গভীর রাতে ইসলামাবাদের কাছে একটি বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। 

ইসলামাবাদ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

বাণিজ্যিক বিমান থেকে নেমে গালিবাফ পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সাথে সাক্ষাৎ করেন। উল্লেখ্য, জেনারেল মুনিরের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক রয়েছে।

জেনারেল মুনির নূর খান বিমানঘাঁটির লাল গালিচায় ভ্যান্সকেও স্বাগত জানান। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।

তবে চিরবৈরী এই দুই পক্ষ কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়াসহ প্রধান ইস্যুগুলোতে এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছে। উভয় পক্ষই শুরুতেই একে অপরের প্রতি গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে গালিবাফ অবতরণের পরপরই বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য ভালো, কিন্তু আমরা কাউকে বিশ্বাস করি না। আমেরিকানদের সঙ্গে আলোচনার অভিজ্ঞতা সব সময়ই ব্যর্থতা আর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।’

ট্রাম্পের নির্দেশে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়া ভ্যান্স আসার পথে জ্বালানি নেওয়ার জন্য প্যারিসে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেন। 

যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের আগে ভ্যান্স বলেন, ‘ইরান যদি সৎভাবে আলোচনা করতে চায়, তবে আমরা অবশ্যই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেব। কিন্তু তারা যদি আমাদের সাথে ছলচাতুরি করতে চায়, তবে দেখবে এই প্রতিনিধি দল মোটেও নমনীয় নয়।’

ইতোমধ্যেই এই যুদ্ধবিরতি হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত হামলা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। গত বুধবার সেখানে হিজবুল্লাহর প্রবেশের পর সবচেয়ে ভয়াবহ বোমা হামলা চালায় ইসরাইল। যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই এই হামলায় কয়েকশ মানুষ নিহত হয়েছে।

উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, এই আলোচনা মোটেও সহজ হবে না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইলের পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধের চেষ্টা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সামনে আরও কঠিন পথ রয়েছে। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘মেক অর ব্রেক’, এটি এখন ঠিক সেই পর্যায়ে আছে।’

আলোচনা কখন শুরু হবে তা স্পষ্ট না হলেও তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দুপুর ১টায় ইরানি প্রতিনিধি দল শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দেখা করতে পারে।

ইরানের ৭০ সদস্যের প্রতিনিধি দল এই আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং তাদের জব্দ করা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। তবে এর কোনটিই এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার দাবি তুলেছেন। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল এই প্রণালী দিয়েই পরিবহন করা হয়। 

ট্রাম্প শুক্রবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের সহযোগিতা থাকুক বা না থাকুক, খুব শিগগিরই এটি খুলে দেওয়া হবে। আলোচনায় আমার প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানের কাছে যেন কোনো ‘পারমাণবিক অস্ত্র’ না থাকে।

শনিবার পাকিস্তানের রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত জোরদার করা হয়েছে। সরকারি ও কূটনৈতিক জোন হিসেবে পরিচিত ‘রেড জোন’-এর চারপাশের রাস্তাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। শহরের প্রধান বিলাসবহুল হোটেলটি থেকে সাধারণ অতিথিদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

দুই পক্ষ মুখোমুখি বসবে নাকি ওমানের মধ্যস্থতায় আগের মতো পরোক্ষভাবে আলোচনা করবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, নৌ-চলাচল, পারমাণবিক ইস্যুসহ অন্যান্য কারিগরি বিষয়ে সহায়তা দিতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি দল গঠন করেছে পাকিস্তান।

এই আলোচনার দিকে কড়া নজর রাখছে মিশর, তুরস্ক ও চীন। পাকিস্তান এই দেশগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। বেইজিং এই চুক্তির সম্ভাব্য জামিনদার (গ্যারান্টার) হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প এএফপি’কে নিশ্চিত করেছেন যে ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে চীন সহায়তা করেছে।

স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরাইলের দাবি। ইসরাইলের মতে, বর্তমান যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে ইরান লেবাননে হামলা বন্ধের দাবি জানালেও শুক্রবার দেশটিতে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলি বিমান হামলা অব্যাহত ছিল। 

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লাইটার জানিয়েছেন, তার দেশ আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে লেবানন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবে, তবে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে কোনো কথা বলবে না।

এদিকে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলে এবং লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনীর ওপর ড্রোন ও রকেট হামলা চালিয়েছে। 

সামগ্রিক পরিস্থিতিতে তেহরানের এক বাসিন্দা সংশয় প্রকাশ করে বলেন, আলোচনার ফলাফল নিয়ে তিনি আশাবাদী নন এবং ট্রাম্পের বক্তব্যকে কেবলই ‘আস্ফালন’ বলে মনে করেন।