শিরোনাম

ঢাকা, ৭ এপ্রিল ২০২৬ (বাসস): পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেছেন, বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনের প্রধান চালিকাশক্তি।
তিনি আরো বলেন, ‘একটি শক্তিশালী এসএমই খাত জাতীয় অর্থনীতির অপরিহার্য ভিত্তি। সমৃদ্ধ এসএমই খাত ছাড়া বৃহৎ শিল্প টিকে থাকতে পারে না।’
আজ রাজধানীর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর জাতীয় প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার এবং পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিবিএস-এর মহাপরিচালক মো. ফারহান সিদ্দিকী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রকল্প পরিচালক ড. দীপঙ্কর রায় এবং জাতীয় প্রতিবেদন বিষয়ে কারিগরি উপস্থাপনা করেন উপ-প্রকল্প পরিচালক মো. মিজানুর রহমান।
প্রতিমন্ত্রী বর্তমান অর্থনীতির সীমিত কিছু রপ্তানিমুখী পণ্যের ওপর নির্ভরতার সমালোচনা করে বলেন, কেবল রপ্তানিনির্ভর বিশেষত অল্প কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল-অর্থনীতি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না।
প্রতিমন্ত্রী এই কৌশলের বিভিন্ন কৌশলগত সুফল তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে— বৃহৎ শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি স্থিতিশীল ও প্রয়োজনীয় ভিত্তি গড়ে তোলা; অভ্যন্তরীণ বাজারব্যবস্থা শক্তিশালী করে দেশীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা; সীমিত কিছু রপ্তানি পণ্যের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় অর্থনীতির ঝুঁকি হ্রাস করা; এবং আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক শিল্প পরিবেশের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো।
ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, প্রবেশের বাধা কমানো সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নত হলে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে এবং জাতীয় জিডিপিতে আরো কার্যকর অবদান রাখতে পারবে।
টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পরিচালন ব্যয়ের পরিবর্তে মূলধনী ব্যয়ে জোর দেওয়ার প্রয়োজনের কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারি বিনিয়োগ এমনভাবে বাড়াতে হবে, যাতে তা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত ও সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
তিনি আরো বলেন, করের আওতা সম্প্রসারণ এই নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমান কর ভিত্তি সীমিত থাকায় এসএমই খাতের সম্প্রসারণই রাজস্বভিত্তি বাড়ানোর প্রধান উপায়। যা সরকারের জন্য ঋণনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব আয় থেকে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা সহজ করবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এসএমই উন্নয়ন, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সমন্বয়ই এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল কৌশল।
অর্থনৈতিক শুমারি-২০২৪ এর তথ্য উপস্থাপন করে মিজানুর রহমান জানান, দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২। যা ২০১৩ সালে ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫ অর্থাৎ বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
একই সময়ে মোট কর্মসংস্থান (টিপিই) বেড়ে হয়েছে ৩ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৬১ জন, যা ২৫ দশমিক ০৩ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এতে দেখা যায়, অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধির হার কর্মসংস্থান বৃদ্ধির তুলনায় বেশি।
মিজানুর রহমান আরো জানান, ২০২৪ সালের শুমারিতে গ্রাম ও শহর উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। গ্রামাঞ্চল সংখ্যার দিক থেকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলেও শহরাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে গ্রামে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮২৮টি এবং শহরে ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৪টি। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৫৫ লাখ ৮৯ হাজার ১৯টি এবং ২২ লাখ ২৯ হাজার ৫৪৬টি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে স্থায়ী ইউনিট ৬২ লাখ ৬৯ হাজার ৪৫৭টি (৫৩.৫৭%), অস্থায়ী ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৯৬৯টি (৪.৯১%) এবং অর্থনৈতিক গৃহস্থালি ইউনিট ৪৮লাখ ৫৯ হাজার ৩৬৬ (৪১.৫২%)।
বিভাগভিত্তিক হিসেবে সর্বোচ্চ ২৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক ইউনিট ঢাকায় এবং সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ সিলেটে অবস্থিত। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৭ দশমিক ৫১, রাজশাহীতে ১৪ দশমিক ৩৬, খুলনায় ১২ দশমিক ৭৩, রংপুরে ১১ দশমিক ৪১, ময়মনসিংহে ৬ দশমিক ৬৩ এবং বরিশালে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ ইউনিট রয়েছে।
শিল্প শ্রেণিভাগে দেখা যায়, মাইক্রো শিল্প ৫৬ দশমিক ৬৭ (৬৬ লাখ ৩১ হাজার ৪৮২), কুটির শিল্প ৩৮ দশমিক ৭৪ (৪৫ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮৯), ক্ষুদ্র শিল্প ৪ দশমিক ২০ (৪ লাখ ৯২ হাজার ৩২৩), মাঝারি শিল্প শূন্য দশমিক ৩১ (৩৬ হাজার ১১২) এবং বৃহৎ শিল্প শূন্য দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ (৯ হাজার ২৮৬)।
দেশের মোট স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ ব্যক্তি বা পারিবারিক মালিকানাধীন। এছাড়া অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ৬ দশমিক ৩৯, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত ২ দশমিক ২২, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি ১ দশমিক ৮২ এবং অংশীদারিত্বভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের ৯০ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ সেবা খাতে এবং ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ শিল্প খাতে। এর মধ্যে পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য খাতের অংশ ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ, পরিবহন ও সংরক্ষণ ২২ দশমিক ২২ শতাংশ, উৎপাদন ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং আবাসন ও খাদ্যসেবা খাত ৮ দশমিক ১১ শতাংশ।
অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ অনুযায়ী, মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে পুরুষ ৮৩ দশমিক ২৮ শতাংশ (২ কোটি ৫৫ লাখ ১১ হাজার ৬৫২), নারী ১৬ দশমিক ৭১ শতাংশ (৫১ লাখ ১৯ হাজার ২৭১) এবং হিজড়া শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ (১ হাজার ৭৩৮ জন)।