শিরোনাম

ঢাকা, ৯ মার্চ, ২০২৬ (বাসস): পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি আজ বলেছেন, অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ এ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। দেশের উন্নয়নের সুফল যেন প্রতিটি মানুষ পেতে পারে সেটার উপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।
তিনি বলেন, নির্বাচনি ইশতেহারে বর্ণিত আর্থিক সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর নীতি প্রণয়নে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সরকার সচেতন এবং এ অভিঘাত মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আজ রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকার প্রাধান্য দিবে। তিনি বলেন, করজাল সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও আমরা ততটা মনোযোগী নই, ফলে আমাদের স্থানীয় ও বৈশ্বিক ঋণের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে, এ অবস্থা নিরসনে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।
ঢাকা চেম্বার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন, সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্রাজুয়েশন প্রজেক্ট (এসএসজিপি)-এর অতিরিক্ত সচিব ও প্রকল্প পরিচালক এ. এইচ. এম. জাহাঙ্গীর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, এলডিসি উত্তরণ, মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প ও ম্যানুফেকচারিং খাত, সিএমএসএমই, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, লজিস্টিক অবকাঠামো এবং আর্থিক খাতের উপর বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, অতিসম্প্রতি শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাতের কারণে সামগ্রিক বৈশ্বিক বাণিজ্যে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে, বিশেষকরে আমাদের শিল্পখাতে ব্যবহৃত জ্বালানির বড় অংশ আমদানি নির্ভর হওয়ায় দেশের বেসরকারিখাতে অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেই সাথে মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক নতুন শুল্ক নীতি স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব আসতে পারে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
দেশের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় এলডিসি উত্তরণ আরো ৩ বছর পিছিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে খাতভিত্তিক পরিকল্পনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের উপর তিনি জোরারোপ করেন।
তিনি আরো বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি সহনীয় করতে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রত্যাহার, সুদহার হ্রাস, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, সাপ্লাইচেইন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা সুদৃঢ়করণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার কোনো বিকল্প নেই।
এছাড়াও স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগে গতি আনয়নের লক্ষ্যে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় হ্রাসে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত নিশ্চিতকরণ ও সর্বোপরি আইন-শৃঙ্খলা পরিবেশ উন্নয়ন একান্ত অপরিহার্য বলে তিনি মত দেন।
টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা প্রণয়ন, অনশোর ও অফশোর অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান তাসকীন আহমেদ।
বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন, আয় ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে সহায়তা প্রদানের কাজ করছে নতুন সরকার, যা প্রশংসার দাবি রাখে।
তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীতকরণে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করতে হলে সবার আগে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। এক্ষেত্রে উৎপাদানশীল খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং বিশেষ করে এসএমইদের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হলে নতুন পদ্ধতি ও পন্থা নিশ্চিত করতে হবে।
শুধুমাত্র ব্যাংক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করলে সুফল পাওয়া যাবে না, এছাড়াও এসএমইদের টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে বৃহৎ শিল্পের চাকাকেও গতিশীল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সার্বিকভাবে একটি বিনিয়োগ বান্ধব পরিস্থিতির জন্য উচ্চ সুদ হার কোনো ভাবেই কাম্য নয় বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
এসএসজিপি’র অতিরিক্ত সচিব এ. এইচ. এম. জাহাঙ্গীর বলেন, এলডিসিভুক্ত থাকায় বাংলাদেশ এতদিন শুল্ক মুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছিল এবং চলতি বছর এলডিসি উত্তরণের সিদ্ধান্ত থাকলেও গতমাসের ১৮ তারিখে এলডিসি উত্তরণের সময় সীমা আরো ৩ বছর পিছিয়ে নেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং এক্ষেত্রে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন বলেন, সম্প্রতি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি নিতে হবে, তা না হলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়াও অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)-এর চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, সরকারকে আয়ের জন্য শুল্কের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা কমাতে হবে এবং সেই সাথে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার বিষয়টিও একটি নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ও যৌক্তিক হওয়া প্রয়োজন।
এনবিআরের কর কাঠামোর আমূল সংস্কারের উপর তিনি জোরারোপ করে বলেন, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যদিও এটি বাস্তবায়নে প্রচুর প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং বেসরকারি খাতকে সরকারের উপর চাপ প্রয়োগে উদ্যোগী হতে হবে।
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো অর্থায়ন, যা মোকাবেলায় ব্যাংকখাতকে সংস্কারের মাধ্যমে আরো উদ্যোগী হতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি প্রাপ্তিতে ব্যক্তি ও শিল্প পর্যায়ে হতাশা ও শঙ্কা রয়েছে জানিয়ে তিনি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আনতে বাজেট, মুদ্রানীতি ও সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনার উপর জোর দিতে হবে। রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির অন্যান্য কোনো খাতে আমরা স্বস্তিতে নেই, এখানে স্বস্তির পরিবেশ নিশ্চিতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
করহার বাড়ানোর জন্য করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি সমগ্র রাজস্ব কাঠামোকে অটোমেশনের আওতায় নিয়ে আসার উপর তিনি জোরারোপ করেন।
ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দসহ সরকারি-বেসরকারিখাতের আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।