শিরোনাম

ঢাকা, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক (জানুয়ারি) অনুযায়ী, বাংলাদেশের ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি (প্রায় ৫ শতাংশ) ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মধ্যে একটি ভারসাম্য দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
আজ প্রকাশিত জিইডির আপডেট ও আউটলুকে বলা হয়, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময়ে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণে সুশাসন, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং দক্ষতা ও প্রযুক্তিতে টেকসই বিনিয়োগ অত্যন্ত প্রয়োজন।
জিইডি উল্লেখ করেছে, স্বল্পমূল্যের শ্রম মডেল থেকে উচ্চমূল্যের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য একটি স্থিতিশীল এবং সংস্কারকৃত রাজনৈতিক পরিবেশ, স্মার্ট প্রযুক্তির সমন্বয় অপরিহার্য। তবে অর্থনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে অনিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এখনো বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে অগ্রগতি এখনো ধীরগতি। এ ক্ষেত্রে গ্রাম পর্যায়ের উদ্যোগের মাধ্যমে তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ টেকসই উন্নয়ন ফলাফল অর্জনে সহায়ক হতে পারে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা নভেম্বর মাসে ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি উচ্চমাত্রায় থাকায় এই বৃদ্ধি ঘটেছে।
এই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যদিও খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে রয়েছে।
যদিও সব ধরনের চালের মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী ধারায় ছিল, তবুও চালের দাম সামগ্রিকভাবে উচ্চই রয়ে গেছে।
সার্বিক চালের মূল্যস্ফীতি নভেম্বরের ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে ডিসেম্বরে ১১ দশমিক ৯২ শতাংশে নেমে আসে। এ সময়ে মাঝারি চালের মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯৬ শতাংশ থেকে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশে, চিকন চালের মূল্যস্ফীতি ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ থেকে ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশে এবং মোটা চালের মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে ১০ দশমিক ৯২ শতাংশে নেমে আসে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান নভেম্বরের ৪০ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে ডিসেম্বরে ৩৭ দশমিক ৩৪ শতাংশে কমে যায়। বিপরীতে, মাছ ও শুঁটকি মাছের অবদান ৪০ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৩ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়ায়, যা ডিসেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় উৎসে পরিণত হয়।
পেঁয়াজের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতিতে অবদান ঋণাত্মক থেকে ইতিবাচকে পরিণত হয়েছে, অন্যদিকে আলু বড় ধরনের মূল্যহ্রাসকারী পণ্য হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।
ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে, ফলে এ দুটির মধ্যে ব্যবধান আরও বেড়েছে। যেখানে মূল্যস্ফীতি ০ দশমিক ২০ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে, সেখানে মজুরি মূল্যস্ফীতি সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৮ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ০৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর প্রাথমিক ত্রৈমাসিক জাতীয় হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
প্রাথমিক অনুমিত হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্থির মূল্যে সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭২ শতাংশে পৌঁছেছে।
খাতভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যাপক উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সংকোচনের পর ঘুরে দাঁড়িয়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পরিবহন, আবাসন এবং তথ্যসেবা খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জিডিপিতে কৃষি খাতের অংশ কমে ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশে নেমে এসেছে, অন্যদিকে শিল্প খাতের অংশ বেড়ে ৩৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ধীরে ধীরে কাঠামোগত রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়।
অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। নভেম্বর মাসে বছরওয়ারি হিসাবে আমানত প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৮ শতাংশে। সরকারি খাতে ঋণ সম্প্রসারণ দ্রুত বেড়ে নভেম্বর মাসে ২৩ দশমিক ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সরকারের উচ্চমাত্রার ঋণ গ্রহণকে প্রতিফলিত করে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশে রয়ে গেছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগের হ্রাস নির্দেশ করে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে রাজস্ব আদায় দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ১৯১ কোটি টাকা, যা সংশোধিত মাসিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা কম। তবে নভেম্বরের তুলনায় এবং বছরওয়ারি হিসাবে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) চূড়ান্ত করা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকায়, যা মূল এডিপির ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে কম। এটি আর্থিক চাপ এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার প্রতিফলন।
যেসব খাতে বাস্তবায়ন সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে ভালো, সেসব খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর মধ্যে পরিবেশ, বন ও পানি সম্পদ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে ২০ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে বেড়েছে ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ। বিপরীতে স্বাস্থ্য, পরিবহন, শিক্ষা ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বরাদ্দ কমানো হয়েছে।
বরাদ্দ কমানো হলেও অনুমোদিত প্রকল্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অপেক্ষাকৃত কম অর্থায়নে বিস্তৃত উন্নয়ন কর্মসূচির ইঙ্গিত দেয়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মোট রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহও শক্তিশালীভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ডিসেম্বর মাসে ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা নিয়ন্ত্রক প্রণোদনা এবং অনুকূল বিনিময় হার ব্যবস্থার ফলে সম্ভব হয়েছে।
রপ্তানি আয় স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিয়েছে এবং গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এ ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক খাতই প্রধান অবদানকারী হিসেবে রয়ে গেছে।
ডিসেম্বর মাসে বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল এবং প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার (আরইইআর) বিবেচনায় মুদ্রার মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমেছে।