শিরোনাম

ঢাকা, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোটকে সামনে রেখে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ বুধবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করাই সরকারের মূল দায়িত্ব। এটি জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করে নির্বাচনকে একটি ঐতিহাসিক অর্জনে রূপ দিতে হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের দিন যেন কোথাও কোনো ঘাটতি না থাকে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি যেন কোথাও কোনো গলদ না থাকে। ২০২৬ সালের নির্বাচন এমন হতে হবে, যা ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোর জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সভায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান, মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া, স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গণি, নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ, পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম, বর্ডার গার্ডের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ, কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে আজ থেকেই ধাপে ধাপে প্রস্তুতি ও পরীক্ষা শুরু হলো। ১২ ফেব্রুয়ারি হবে এর চূড়ান্ত পর্ব। এখন সবচেয়ে বড় নির্দেশ হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবে। এ নির্বাচনে প্রচলিত চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি নতুন করে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও যুক্ত হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, এবারের নির্বাচনে বডি ক্যামেরা ও সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ে কোনো ঘাটতি রাখা যাবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচন কভার করবে দেশি-বিদেশি বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষণে দেশি-বিদেশি বিপুলসংখ্যক পর্ষবেক্ষক আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিষয়টি তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। আমাদেরও সমানভাবে সুপার সিরিয়াস থাকতে হবে।
বর্তমান প্রস্তুতি ও পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, প্রার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব ও সৌহার্দ্য বজায় আছে, আশা করি তা শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
সভায় নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জানান, নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ২৬টি দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৩০০ সদস্যের পর্যবেক্ষক দল আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫৬ জন ইতোমধ্যে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তাঁদের দুজন প্রতিনিধি মনোনয়নপত্র সংক্রান্ত আপিল প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন।
তিনি জানান, আজ মধ্যরাত থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে ৭টা পর্যন্ত প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন। সাইবার স্পেসে অপতথ্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হওয়ায় গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, নির্বাচনের দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে তাঁর মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা হবে।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া ৩ হাজার ৬১৯টি অস্ত্রের মধ্যে ২ হাজার ২৫৯টি উদ্ধার করা হয়েছে, যা লুটকৃত অস্ত্রের ৬২.৪ শতাংশ।
তিনি আরও জানান, একই সময়ে দেশের বিভিন্ন থানা থেকে লুটকৃত গোলাবারুদের পরিমাণ চার লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড। এর মধ্যে ইতোমধ্যে দুই লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড উদ্ধার হয়েছে, যা লুটকৃত গোলাবারুদের ৫২ শতাংশ।
তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় জনমনে স্বস্তি নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলো পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা সামনের দিনগুলোতে কার্যকর করা গেলে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র আনসার সদস্য ভোটকেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান করবেন। ফলে চাইলেই কেউ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দিতে পারবে না। কাউকে কেন্দ্রের ভেতর কোনো প্রকার বেআইনি কাজ করতে দেওয়া হবে না।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে বিবেচিত হবে। সুতরাং প্রয়োজন হলে তারা ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় প্রবেশ করতে পারবে।
স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গণি বলেন, বডি ক্যামেরা ও ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে পরিস্থিতি সরাসরি মনিটর করা হবে। ভোটের চার দিন আগে বাহিনী মোতায়েন শুরু হবে এবং ভোটের পর সাত দিন তারা মাঠে থাকবে।
তিনি বলেন, আজ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে একাধিক টিম নির্বাচন সংক্রান্ত মাঠপর্যায়ের যাবতীয় তথ্য ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং ও রেকর্ড করবে। বডি ক্যামেরার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কানেক্ট হওয়া যাবে। এর মাধ্যমে সব ঘটনা রেকর্ড করা যাবে।
এ সময় তিনি বডি ক্যামেরা ব্যবহারের ওপর একটি ভিডিওচিত্র উপস্থাপন করেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বডি ক্যামেরার নানা সম্ভাবনার দিক আছে। এর সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে নির্বাচনী নিরাপত্তায় বিশেষ সাফল্য পাওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে, এমনকি প্রয়োজন হলে আরও কম দিনের ব্যবধানে বৈঠকে বসা হবে।