বাসস
  ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:০১

জুলাই যোদ্ধাদের ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’ সংক্রান্ত সব কর্মকাণ্ডে পূর্ণ ‘দায়মুক্তি’

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন ড. আসিফ নজরুল। ছবি: সিএ প্রেস উইং

\ দিদারুল আলম ও নাজিউর রহমান সোহেল \

ঢাকা, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের আইনি সুরক্ষা দিতে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ।

আজ উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদিত এই ঐতিহাসিক অধ্যাদেশের মাধ্যমে জুলাই যোদ্ধাদের ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’ সংক্রান্ত সকল কর্মকাণ্ডে ‘পূর্ণ দায়মুক্তি’ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত আগের (২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত) সকল ধরনের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার এবং নতুন করে মামলা দায়েরের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার বিধান রাখা হয়েছে অধ্যাদেশে। 

তবে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত কোনো হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক প্রতিরোধের পরিবর্তে সংকীর্ণ ও একান্ত ব্যক্তিগত স্বার্থে সংঘটিত কি না, তা নির্ধারণের ক্ষমতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছে।

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে আজ রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, এই অধ্যাদেশটি জুলাই বিপ্লবীদের জীবন বাজি রাখা সংগ্রামের প্রতি সরকারের ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের লক্ষ্যে পরিচালিত সকল কর্মকাণ্ড ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর জন্য কাউকে ফৌজদারি মামলায় জড়ানো যাবে না। আন্দোলনকালীন উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত পুরোনো সকল মামলা প্রত্যাহার এবং এসব ঘটনায় নতুন কোনো মামলা করাও আইনত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আগামী ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে এ সংক্রান্ত সরকারি গেজেট জারি করা হবে।

‘জুলাইকে নিরাপদ রাখা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব’ উল্লেখ করে সম্প্রতি আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, জুলাই যোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসনমুক্ত করেছিল, তাই অবশ্যই তাদের দায়মুক্তির অধিকার রয়েছে। 

নিজের ভেরিফাইড ফেসবুকে তিনি আরও বলেন, সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ ধরনের দায়মুক্তি অধ্যাদেশের বৈধতা রয়েছে। ১৯৭৩ সালেও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যও দায়মুক্তি আইন হয়েছিল। এছাড়া আরব বসন্তসহ বৈশ্বিক বহু গণ-অভ্যুত্থানে এমন নজির রয়েছে। 

অধ্যাদেশে যা আছে : 

অধ্যাদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও গণ-অভ্যুত্থানকারীর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। অধ্যাদেশে ‘গণ-অভ্যুত্থানকারী’, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’, ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’ এবং ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার’ এবং কমিশন- এর স্পষ্ট সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। 

মামলা প্রত্যাহার ও নতুন মামলা দায়ের নিষিদ্ধ : অধ্যাদেশের ধারা ৪-এ বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করা হবে। সরকার কর্তৃক প্রত্যয়ন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট আদালত এসব মামলা থেকে অভিযুক্তদের অব্যাহতি বা খালাস দেবেন। এছাড়া এসব ঘটনায় গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা দায়ের করা আইনত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 

মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত : অধ্যাদেশ অনুযায়ী, যদি কোনো গণ-অভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে তা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত করা হবে। তদন্তে যদি দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক প্রতিরোধের পরিবর্তে সংকীর্ণ ও ব্যক্তিগত স্বার্থে (বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার) সংঘটিত হয়েছে, তবেই কেবল প্রচলিত আদালতে বিচারিক কার্যক্রম চলবে।

ক্ষতিপূরণ ও দায়মুক্তি : মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে, সংশ্লিষ্ট কাজটি স্বৈরাচারী শাসন পতনের লক্ষ্যে ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’-এর অংশ ছিল, তবে কমিশন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য সরকারকে আদেশ দিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো মামলা বা আইনি কার্যক্রম চালানো যাবে না।

যৌথ দায় ও ষড়যন্ত্রের দায়মুক্তি : কেবল উপস্থিতি, সাধারণ অভিপ্রায় বা অনুমানের ভিত্তিতে যৌথ দায় (জয়েন্ট লায়াবিলিটি), প্ররোচনা বা ষড়যন্ত্রের দায় আরোপ করা এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে (ধারা-৬)।

তদন্তে স্বচ্ছতা : 

অধ্যাদেশে শর্ত রাখা হয়েছে যে, যদি হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি কোনো বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকেন, তবে তদন্তের স্বার্থে উক্ত বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান বা প্রাক্তন কোনো কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। এছাড়া তদন্ত চলাকালে কাউকে গ্রেপ্তার করতে হলে কমিশনের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে পাঠানো সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে, সময়ের স্বল্পতার কারণে খসড়া অধ্যাদেশের উপর অংশীজন সভা ও জনমত যাচাইয়ের লক্ষ্যে অত্র বিভাগের ওয়েবসাইটে সংশোধনীর খসড়া প্রকাশ করা হয়নি। তবে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ‘আইনের খসড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক মতামত প্রদান-সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি’র সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে এবং ওই সুপারিশের আলোকে খসড়া অধ্যাদেশটি প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয়েছে।