শিরোনাম

রাজবাড়ী, ২৭ জুলাই, বাসস, (২০২৬) : দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রাজবাড়ীর অ্যাক্রোবেটিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আবারও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে যাচ্ছে।
এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ২০ জন শিশু-কিশোর প্রশিক্ষণার্থী উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও নতুন নতুন অ্যাক্রোবেটিক কৌশল আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যে আগামী ৫/৬ আগস্ট-২৭ (টিকিট পাওয়া সাপেক্ষে) চীনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবে বলে জানা গেছে।
এই সফরকে ঘিরে প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে বিরাজ করছে উৎসব মুখর পরিবেশ ও ব্যাপক উদ্দীপনা। দীর্ঘদিনের অনুশীলন, অধ্যবসায় এবং দক্ষতাকে আরও শাণিত করার প্রত্যাশা নিয়ে তারা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অ্যাক্রোবেটিক ঐতিহ্যের দেশ চীনে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই প্রশিক্ষণ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আক্রোবেটিক শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ সৃষ্টি করবে।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল কর্মকর্তা সুজিত কুমার সাহা বাসস’কে জানান, রাজবাড়ীতে অবস্থিত বাংলাদেশের একমাত্র অ্যাক্রোবেটিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপিকা জাহানারা বেগমের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়।প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এটি দেশের শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে থাকা মেধাবী শিশু-কিশোরদের মধ্যে অ্যাক্রোবেটিক শিল্পের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি এবং তাদের দক্ষ শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই এই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও প্রতিষ্ঠানটি টিকে আছে এবং ধারাবাহিকভাবে নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে।
অ্যাক্রোবেটিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার সময় তৎকালীন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আব্দুস সালাম তালুকদার এক শুভেচ্ছা বাণীতে বলেছিলেন, ‘জাতীয় সংস্কৃতির উন্নয়ন, বিকাশ ও প্রসারে আক্রোবেটিক একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।’
তিনি আরও উল্লেখ করেছিলেন, ‘অ্যাক্রোবেটিক সংস্কৃতি ও চিত্তবিনোদনের ক্ষেত্রে উৎসাহব্যঞ্জক ভূমিকা রাখতে সক্ষম।’
অন্যদিকে, তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপিকা জাহানারা বেগমও অ্যাক্রোবেটিক শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, উত্তর কোরিয়ার একটি বিশেষজ্ঞ দলের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। এই উদ্যোগ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্রতিভাবান শিশুদের বিকাশে সহায়ক হবে এবং তাদের মধ্যে অ্যাক্রোবেটিক শিল্পের প্রতি আরও আগ্রহ সৃষ্টি হবে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজবাড়ী অ্যাক্রোবেটিক সেন্টার দেশে নানা জেলায় বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রশংসা অর্জন করেছে। এখানকার প্রশিক্ষণার্থীরা বহুবার তাদের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনার মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। শারীরিক কৌশল, নান্দনিক উপস্থাপনা এবং দলগত সমন্বয়ের কারণে এই শিল্পধারা দিন দিন জনপ্রিয়তা লাভ করছে।
বর্তমানে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র চীনের আমন্ত্রণে ২০ সদস্যের শিশু-কিশোর অ্যাক্রোবেটিক দলটি উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। চীনের আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ও নতুন নতুন কৌশল শেখার মাধ্যমে তারা নিজেদের দক্ষতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে তারা অর্জিত অভিজ্ঞতা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেবে এবং বাংলাদেশের অ্যাক্রোবেটিক শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে ভূমিকা রাখবে।
গত ১৮ জুলাই সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম রাজবাড়ী জেলার একমাত্র শিল্পকলা একাডেমিতে শিল্পী মনসুর উল করিমের ৭৬তম জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বলেন, ‘আমাদের শিল্প সংস্কৃতিকে আরও এগিয়ে নেয়ার জন্য আমাদের ২০ জনের ক্ষুদ্র অ্যাক্রোবেটিক শিশু - কিশোরদের প্রশিক্ষণের জন্য চীনে পাঠানো হচ্ছে।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী দেশের শিল্প সংস্কৃতি এগিয়ে নিতে লেখা পড়ার পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চার প্রতিও জোর দেয়ার আহ্বান জানান’। তিনি বলেন, এ বছর আমার চীন সফরের সময় আমাদের দেশের শিল্প, সংস্কৃতি আরো এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে দেশটির নেতৃবৃন্দের সাথে উভয় দেশের সহযোগিতার কথা বলেছি।
মন্ত্রীর এই আশ্বাস পাওয়ার পর অনেক দিনের ঝিমিয়ে পড়া অ্যাক্রেবেটিক শিল্পীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার মাত্রা যোগ হয়েছে। জেলার ১৩ জন ছেলে ও ৫ জন মেয়েসহ ২ জন শিক্ষক সফরে যুক্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সফর শুধু একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। রাজবাড়ীর ছোট্ট একটি প্রতিষ্ঠান থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিশু-কিশোরদের এই যাত্রা প্রমাণ করে, যথাযথ সুযোগ ও প্রশিক্ষণ পেলে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম বিশ্বমঞ্চেও নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারে।
রাজবাড়ীর অ্যাক্রোবেটিক সেন্টারের এই নতুন যাত্রা দেশের সংস্কৃতি চর্চায় এক অনন্য অধ্যায় রচনা করবে-এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্ট সকলের।