বাসস
  ১৮ আগস্ট ২০২১, ১৪:৫৫
আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২১, ১৫:৪৪

তথ্য প্রযুক্তির প্রসারে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছেছে সরকারি পরিষেবা

॥ ড. আইনাল হক ॥

রাজশাহী, ১৮ আগস্ট,২০২১ (বাসস) : তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ও প্রশিক্ষণের ফলে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে গেছে সরকারি পরিষেবা। কেবল শহর বা উপশহর নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীও এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ এর সুবিধা ভোগ করছেন। 
আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি)’র মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সরকারি পরিষেবা গ্রামীণ জীবনে নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। প্রযুক্তি ভিত্তিক জ্ঞান ও বিভিন্ন  ডিভাইসের যথাযথ ব্যবহার করে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর কাছে এসব সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে অগ্রণী ভুমিকা পালন করছেন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) ও বেসরকারি অনলাইন উদ্যোক্তারা।  
রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার হুজরিপাড়া  ইউডিসি’র উদ্যোক্তা জিয়াউল  হক  ‘একসেবা’র মাধ্যমে  প্রায় ১০০ ধরনের  সেবা প্রদান করে আসছেন।  এখানে   সরকারি  বিভিন্ন  সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকায়  গ্রামবাসী  উপকৃত হচ্ছেন। 
ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার ‘একসেবা’ সব ধরনের ডিজিটাল  সরকারি সেবা  প্রদানের প্লাটফর্ম হিসেবে  কাজ করছে। যে কোন প্রার্থী  নির্দিষ্ট  ফি পরিশোধের মাধ্যমে  অনলাইনে আবেদন জমা দিতে পারেন এবং তার চাহিদাকৃত কাজের সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারেন।
জিয়াউল হক গত ছয় মাসে প্রায়  ৭ হাজার ২’শ জনকে এসব সরকারি সেবা দিয়েছেন। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি  সরকারকে  ৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা রাজস্ব  দিয়েছে। এছাড়াও এসব পরিষেবা থেকে তার নিজের আয় হয়েছে ৬৫ হাজার টাকা।
তিনি  জানান, এই কেন্দ্র থেকে কৃষি, ভুমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং আইনি সহায়তাসহ বিভিন্ন পরিষেবার পাশাপাশি ছাত্র ও বেকার যুবকদের কম্পিউটার  প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যা  বেকার যুবকদের বিভিন্ন আয়বর্ধক কাজে সক্ষম করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এখান  থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে  ২৭ জন বেসরকারি উদ্যোক্তা এলাকায় সামাজিক সুরক্ষা নেট, ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট এবং জন্ম নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবা দিচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হুজরিপাড়া ইউডিসিতে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, লেজার প্রিন্টার, কালার প্রিন্টার, প্রজেক্টর, মডেম, ডিজিটাল ক্যামেরা, স্ক্যানার, আইপিএস, ইউপিএস এবং ফটোকপি মেশিনের মতো বিভিন্ন প্রয়োাজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে। যা  ডিজিটাল সেন্টারটিকে সমৃদ্ধ করেছে। 
ইউডিসি উদ্যোক্তা জিডাউল হক বলেন, গত ছয় মাসে আমরা ১৬০ টি ই-নামজারির কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। ই-নামজারি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রমও এখান থেকে পরিচালনা করা হয়। ভূমি পরিষেবার ডিজিটালাইজেশনের ফলে জনসাধারণ এ সম্পর্কিত ভোগান্তি এবং হয়রানি থেকে রক্ষা পেয়েছে। 
পবা উপজেলার বাজিতপুর গ্রামের একজন অনলাইন উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম জানান, ই-নামজারি এবং চাকরির জন্য অনলাইনে আবেদন জমাসহ জনগণকে বিভিন্ন অনলাইন সেবা প্রদানের মাধ্যমে তিনি প্রতি মাসে গড়ে  প্রায় ১০,০০০ টাকা আয় করেন।
তিনি বলেন, সরকারের  সময়োপযোগী উদ্যোগের কারণে  সাধারণ মানুষের জন্য সব ধরনের সেবা প্রাপ্তি সহজ এবং সাশ্রয়ী  হয়েছে।
একই উপজেলার রাধানগর গ্রামের বাসিন্দা শিরিনা খাতুন বলেন, হুজরিপাড়া ইউডিসির মাধ্যমে আমি আমার নতুন কেনা জমির নামজারি করিয়েছি ২৫ দিনের মধ্যে। এ জন্য আমার খরচ হয়েছে ১,৪৫০ টাকা।’
রাজশাহী জেলা প্রশাসক আবদুল জলিল বলেন, গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন বাজারের ইউডিসি উদ্যোক্তা এবং অনলাইন উদ্যোক্তাদের ই-নামজারির জন্য কিভাবে আবেদন করতে হবে সে বিষয়ে  প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এলাকার মানুষ এখন জমির নামজারির জন্য তাদের মাধ্যমেই আবেদন করতে শুরু করেছে।
সরকারি সেবা পাওয়ার জন্য একসময় গ্রামবাসীদের অতিরিক্ত সময় ও টাকা ব্যয় করতে হতো। তাদের নানারকম হয়রানির শিকার হতে হতো। তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সরকারি সেবাসমূহ সহজ করায় এখন মানুষের ভোগান্তি অনেকাংশে দূর হয়েছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণকে তাদের প্রয়োজনীয় সেবা নিতে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেছে।  
গ্রামীণ জনগণকে সেবা দেয়ার জন্য ওয়ান স্টপ শপ হিসেবে ইউডিসি সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অনলাইনে সবধরনের সরকারি ও বেসরকারি সেবা দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের অধ্যাপক প্রণব কুমার পান্ডে বলেন, অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন, পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন এবং সামাজিক নিরাপত্তা   কর্মসূচিসহ ইউডিসিগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানের মাধ্যমে সমাজ জীবনে দ্বিগুণ অগ্রগতি নিশ্চিত করছে।
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড: হুমায়ুন কবির জানান, বিভাগের আটটি জেলায় ৩০ টি সিটি ডিজিটাল সেন্টার, ৬১ টি পৌরসভা ডিজিটাল সেন্টার এবং ৫৬৩ টি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার রয়েছে। এসব ডিজিটাল সেন্টার তৃণমূলের মানুষের দোরগোড়ায়   সেবা পৌঁছে দিতে অবদান রাখছে।
তিনি জানান, এ সব কেন্দ্রে ৪২০জন নারীসহ প্রায় ১১শ’র বেশি  উদ্যোক্তা  কাজ করছেন। তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সেবা বিতরণ কার্যক্রমের ব্যাপক প্রসারের ফলে  উদ্যোক্তাদের কাজও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইউডিসির সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিসেবা হচ্ছে-জন্ম নিবন্ধন, নাগরিক সনদ এবং অভিবাসী শ্রমিকদের নিবন্ধন। বেসরকারী জনপ্রিয় পরিষেবার মধ্যে রয়েছে মোবাইল আর্থিক সেবা, বীমা, কম্পিউটার এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ। এসব পরিষেবার চাহিদা ক্রমশঃ বাড়ছে। 
ইউডিসি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক বেসরকারি উদ্যোক্তাদের চাহিদা  ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, যাতে  তারা সাধারণ জনগণকে দক্ষতার সাথে কার্যকর  সেবা দিতে পারেন। এটুআই জন্মলগ্ন থেকেই ধারাবাহিকভাবে এসব প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে আসছে।