BSS-BNhrch_cat_news-24-5
বাসস
  ০৬ অক্টোবর ২০২২, ১৯:১৮

পারিবারিক পুষ্টি বাগানে স্বাবলম্বী হচ্ছে গ্রামীণ প্রান্তিক নারী

॥ ওবায়দুল গণি ॥
ঢাকা, ৬ অক্টোবর, ২০২২ (বাসস) : অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙ্গিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগানের ধারনা  বদলে দিচ্ছে নুর মহল বেগমের মত অসংখ্য গ্রামীণ নারীর ভাগ্য। তারা নতুন এ পদ্ধতিতে নিজের বাড়ীর আশেপাশে বিভিন্ন ধরনের তরিতরকারি,শাক ও ফলমূল উৎপাদন করে পরিবারের পুষ্টিচাহিদা পূরণের পাশাপাশি  বাড়তি টাকাও রোজগার করছে। নি¤œমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের নারীরা এভাবে বসত ভিটার উঠোন ও পরিত্যাক্ত জায়গায় সব্জি ও ফল চাষ করে আর্থিকভাবেও হচ্ছেন স্বাবলম্বী।
ঢাকার অদূরে নরসিংদি জেলার শিবপুর উপজেলার আটগাছিয়া গ্রামের নুর মহল বেগম জানালেন, নতুন এই পদ্ধতিতে সবজি বাগান করার কারণে তার পরিবারের দৈনিক সবজির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি গত ছয়মাসে ৬-৭ হাজার টাকা বাড়তি আয়ও হয়েছে।  তিনি বলেন, “আগে তরকারি কিনে খাওয়ার পয়সা ছিল না। এছাড়া তরিতরকারির যে দাম, তাতে প্রতিদিন তরকারি কিনে খাওয়া সম্ভব হতোনা। কিন্তু নতুন এ প্রযুক্তিতে সবজি চাষের কারণে এখন নিজেরা খেতেও পারছি, আবার বাড়তি সবজি বাজারে বিক্রি করতে পারছি”। এই চাষ প্রযুক্তিতে তেমন কোন খরচ নেই, শুধুমাত্র শারিরিক পরিশ্রম করতে হয়। তবে নিয়মিত পরিচর্যা করলে, একই বাগান থেকে সারাবছর নিজেদের প্রয়োজনীয় সবজির চাহিদা মেটানো সম্ভব বললেন একই উপজেলার ধানুয়া উত্তরপারা গ্রামের গৃহবধু উম্মে কুলসুম।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ৪৩৮ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকা ব্যয়ে দেশের ৬৪টি জেলার ৪৯২ টি উপজেলায় তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি নিয়ে কথা হয় ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলাধীন কমলাপুর গ্রামের নুপুর আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানালেন “কোন রকম কীটনাশক ব্যবহার না করে, শুধুমাত্র ভার্মি কম্পোষ্ট সার ও জৈব বালাইনাশক পদ্ধতি অবলম্বন করে এই পুষ্টি বাগান প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি লাউ, মিষ্টিকুমড়া, কলমিশাক, লালশাক, বেগুন ও কাঁচামরিচ আবাদ করেছেন। কোন সবজি তাকে বাজার থেকে কিনতে হয় না। বসতবাড়ীর আঙ্গিনায় পাঁচটি বেড স্থাপনের মাধ্যমে তিনি প্রয়োজনীয় সকল সবজির চাষাবাদ করছেন।” 
নিজের পরিবারের সবজির চাহিদা পূরণ করে গ্রামের অন্যান্যদের এমনকি আত্মীয়-স্বজনদের মাঝেও সবজি বিতরণ করছেন বলে জানালেন একই গ্রামের পুটিজানা ইউনিয়নের মহিলা খামারি জেসমিন আক্তার। প্রকল্পটি কিভাবে মহিলাদের আর্থিকভাবে লাভবান করছে, সে প্রসঙ্গে জেসমিন বলেন, দৈনিক তিনি পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে ৩০০-৪০০ টাকার সবজি বাজারে বিক্রি করছেন। আগে স্বামীর কাছে প্রয়োজনে টাকা চাইতে হতো, কিন্তু এ প্রকল্প গ্রহণের পর তাকে আর স্বামীর কাছে কোন টাকা পয়সা চাইতে হয় না।
সরকারের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হয় এবং এটি ২০২৩ সালে ডিসেম্বরে শেষ হবার কথা রয়েছে। তবে প্রকল্পটির গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধি করার বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। প্রকল্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ ড. মোঃ আকরাম হোসেন চৌধুরী জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, “প্রকল্পটির মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনাবাদি পতিত ও অব্যাবহৃত বসতবাড়ি চাষের আওতায় আনা ও বছরব্যাপী ৫ লক্ষ ৩ হাজার ১৬০ টি কৃষক পরিবারের পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য সবজি ও মসলা জাতীয় ফসল উৎপাদন করাই এর লক্ষ্য।” ড. আকরাম বলেন, বসতবাড়ির অনাবাদি জমিতে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পারিবারিক পুষ্টি বাগান করে কৃষকের শাক-সব্জি, ফল ও মসলার চাহিদা পূরণ, আয়-বৃদ্ধিসহ পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে সহায়ক হবে।
এছাড়া প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে, পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দারিদ্রতা হ্রাসসহ পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণের মাধ্যমে বসতবাড়িতে আদর্শ পুষ্টিবাগান স্থাপিত হবে এবং নতুন প্রযুক্তিরও সম্প্রসারণ হবে।
প্রকল্পের আওতায় কৃষকের দক্ষতা উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রকল্পের উপ-পরিচালক মোঃ আবদুল কাদের আজাদ বলেন, প্রকল্পের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৪৯২ টি উপজেলায় ৬৩ হাজার ২শ ৭০ জন কৃষক/কিষাণী পুষ্টি বাগান করা এবং খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। প্রশিক্ষণকালিন সময়ে তারা যেসব বীজ বা চারা পেয়েছে, তা দিয়ে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কৃষক/কিষাণীরা, তাদের বসতবাড়ির অনাবাদি জমিতে পারিবারিক পুষ্টি বাগান চাষ  করছে। 
অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙ্গিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত বসত বাড়ির অনাবাদি জমিতে ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৯ টি পারিবারিক পুষ্টিবাগান প্রদর্শনী স্থাপিত হয়েছে এবং ১ লাখ ৫২ হাজার ০৮৪ শতক (১৫২০.৮৪ একর) অনাবাদি পতিত জমি চাষের আওতায় এসেছে। পারিবারিক পুষ্টি বাগান প্রদর্শনী স্থাপনে অন্য কৃষকদের তিন মওসুমের বীজ, সার, ছয়টি ফলের চারা ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে পারিবারিক পুষ্টিবাগান প্রদর্শনী থেকে উৎপাদিত সবজি ও ফলমূল থেকে ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৯ টি কৃষক পরিবারের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। 
মাঠপর্যায়ের মনিটরিং কার্যক্রম ও বিভিন্ন কর্মকর্তা, কৃষক/কিষাণী এবং স্থানীয় প্রতিনিধির মতামত ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দেখা যায় যে, প্রতিটি পরিবারিক পুষ্টি বাগান প্রদর্শনী হতে গড়ে প্রতিবছর ৩৭৮ কেজি সবজি উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজার মূল্য প্রায় ৯,৪৫০ টাকা। মোট উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ২৬৬৩১.৩৭ টন এবং মোট বাজার মূল্য ৬৬ কোটি ৫৭ লক্ষ ৮৪ হাজার টাকা। 

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়