বাসস
  ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২১:১৪

তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু অর্থনীতি চাঙ্গা করবে, বাড়াবে সড়ক নেটওয়ার্ক

নারায়ণগঞ্জ, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ (বাসস) : চলতি মাসের শেষে বা আগামী মাসের শেষ প্রথম সপ্তাহে চালু হবে বলে প্রত্যাশিত ছয় লেনের তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নারায়ণগঞ্জ শহরকে বন্দর উপজেলার সাথে সংযুক্ত করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে এবং পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো ও চট্টগ্রামের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করবে।
সেতুটির প্রকল্প পরিচালক শোয়েব আহমেদ বাসসকে বলেন, ১.২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্যে চলাচলকারী যানবাহনগুলো নারায়ণগঞ্জ শহরকে বাইপাস করতে পারবে এবং যানজট এড়াতে ও সময় বাঁচাতে সক্ষম হবে।
তিনি বলেন, সেতুটি উদ্বোধনের পর দেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে চাঙ্গা হবে কারণ এটি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে যানবাহনের যাতায়াতে সময় কমাবে। 
তিনি আরও বলেন, পদ্মা সেতুর সঙ্গে সড়কগুলো পুনঃসংযোগ দিলে দেশ এ সেতু থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পাবে।
তিনি বলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরে সেতুটি যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়ার কথা ছিল। তবে বেশির ভাগ কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হওয়ায় সময়সীমার তিন মাস আগে এই মাসের শেষের দিকে বা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে এটি উদ্বোধন করা হবে।
সেতুটি পূর্বে বন্দর উপজেলার মদনগঞ্জ এবং পশ্চিমে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সৈয়দপুরের সঙ্গে যুক্ত হবে। এখন মোটরচালিত নৌকা নদীর দুই পাড়ের মানুষদের জন্য যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।
বাসসের সাথে আলাপকালে মদনগঞ্জের বাসিন্দা গার্মেন্টস কর্মী তানিয়া জানান, প্রতিদিন সকালে তাকে পায়ে হেঁটে গুদারাঘাটে আসতে হয় এবং তার কর্মস্থলে যেতে নৌকায় নদী পার হতে হয়।
তিনি বলেন, নৌকা প্রায়ই বড় জাহাজের সাথে সংঘর্ষে যাত্রীদের মৃত্যু ঘটায় কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল অনেক বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘এখন নৌকায় করে নদী পারাপার করা আমাদের জন্য ভীতিকর হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে ভয় বেড়ে যায়। সেতুটি চালু হলে আমাদের চলাচল সহজ ও নির্ভয় হবে।’
বন্দর উপজেলার বাসিন্দা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ইউসুফ আতিক মালিক বলেন, সেতুটি স্থানীয় নয় বরং জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
তিনি বলেন, এখন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যানবাহন ঢাকার যাত্রাবাড়ী রুট ব্যবহার করে পোস্তগোলা ব্রিজ হয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে যায় অথবা চাষাড়া ও সাইনবোর্ড রুট ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছায়।
শীতলক্ষ্যা সেতু চালু হলে পঞ্চবটি বিসিক শিল্প এলাকা, পঞ্চবটি মোড়, চাষাড়া মোড়, সাইনবোর্ড, নারায়ণগঞ্জের চট্টগ্রাম সড়ক বা ঢাকার পোস্তগোলা ও শনির আখড়া রুটে যানবাহনকে তীব্র যানজটের সম্মুখীন হতে হবে না বলে জানান শোয়েব আহমেদ।
যানবাহনগুলো রাজধানীর পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ শহরকে বাইপাস করতে পারবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাছাড়া রাজধানী ও নারায়ণগঞ্জ শহরের ওপর যানবাহনের চাপও কমবে।
প্রকল্পটি ২০১০ সালে একনেকে অনুমোদন পেলেও ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি নির্মাণকাজ শুরু হয়।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, সেতুর টোল প্লাজার পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে শুধুমাত্র অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণের কাজ চলমান থাকায় দুটি সার্ভিস লেনসহ সেতুর ৯৭ শতাংশ নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে।
তিনি বলেন, সেতু নির্মাণে ৬০৮.৫৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬৩.৩৬ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের তহবিল থেকে এবং ৩৪৫.২০ কোটি টাকা সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) থেকে এসেছে।
ওয়াকওয়েসহ সেতুটিতে ৩৮টি স্প্যান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে পাঁচটি নদীতে এবং ৩৩টি পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে। হাঁটার পথসহ সেতুটির প্রস্থ ২২.১৫ মিটার। এছাড়া ছয় লেনের টোল প্লাজা এবং দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাপ্রোচ রোডও নির্মাণ করা হচ্ছে।
শীতলক্ষ্যা নদী বন্দর উপজেলা ও সোনারগাঁ উপজেলাকে জেলা সদর থেকে পৃথক করেছে। এ দুটি উপজেলা সরাসরি সড়কপথে জেলা সদরের সাথে সংযুক্ত নয়। দুই উপজেলা থেকে জেলা সদরে যেতে কাঁচপুর ব্রিজ (শীতলক্ষ্যা-১ সেতু) ব্যবহার করতে হয়। এজন্য সড়কপথে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। অথচ নৌপথে এই দূরত্ব মাত্র ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার।
বন্দর উপজেলায় বসবাসকারী কয়েক হাজার মানুষ প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে কাজের জন্য নৌকায় করে শীতলক্ষ্যা নদী পার হয়। একইভাবে নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ থেকেও মানুষ নৌকায়  শীতলক্ষ্যা নদী পাড়ি দিয়ে বন্দর বা সোনারগাঁ উপজেলায় আসে। নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার ৩য় শীতলক্ষ্যা সেতুটি বন্দর উপজেলা ও জেলা সদরের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করবে।
ন্যাশনাল হাইওয়ে-১, ন্যাশনাল হাইওয়ে-২ এবং ন্যাশনাল হাইওয়ে-৮ হয়ে যাতায়াতের জন্য  যথেষ্ট সংখ্যক যানবাহনের চলাচলে সেতুটি একটি বাই-পাস দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সেতুটি ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক (জাতীয় মহাসড়ক-১), ঢাকা-সিলেট রোড (জাতীয় মহাসড়ক-২), ঢাকা-ময়মনসিংহ রোড ইত্যাদি থেকে খুলনা, যশোর, বেনাপোল, মংলা, বরিশাল এবং অন্যান্য স্থানে যাতায়াতের জন্য মদনগঞ্জ-সৈয়দপুর-মুক্তারপুর, মুন্সীগঞ্জ-টঙ্গীবাড়ী-লৌহজং ও মাওয়া হয়ে মোগরাপাড়া, মদনপুর, কাঁচপুর ও ডেমরাকে সংযুক্ত করবে।
 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়