BSS-BNhrch_cat_news-24-5
বাসস
  ০৬ জুলাই ২০২২, ১১:৫৩

মেহেরপুরের বিশ্ববিখ্যাত ব্লাকবেঙ্গল ছাগল বিক্রি হবে ২১৫ কোটি টাকার

॥ দিলরুবা খাতুন ॥
মেহেরপুর, ৬ জুলাই, ২০২২ (বাসস): জেলায় এবার ব্লাক বেঙ্গল জাতের ১ লাখ ২৬ হাজার ছাগল বিক্রি হবে ২১৫ কোটি টাকায়। এমনটা আশা করছেন মেহেরপুর জেলা প্রাণি সম্পদ বিভাগ ও খামারীরা। মেহেরপুর জেলা সদরে বারাদিতে বৃহত্তম ছাগলের হাট। সপ্তাহে দুটি হাটে ৬ হাজার ছাগল বেচাকেনা হচ্ছে। ঈদকে সামনে রেখে হাট দুটি এখন জমজমাট। ‘গরিবের গাভী’ খ্যাত মেহেরপুরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়ের অন্যতম উৎস এ ব্লাকবেঙ্গল।  
ছাগলের গলার রশির অপর প্রান্তে শক্তহাতে ধরে থাকা এরা কেউ বেপারী। কেউবা পারিবারিকভাবে পালিত ছাগলের মালিক। কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে মেহেরপুর জেলা সদরের চুয়াডাঙ্গা সড়কের বারাদিতে জেলা পরিষদ নিয়ন্ত্রিত ছাগলের হাটের চিত্র এটি। হাটে মানুষের চেয়ে ছাগলের সংখ্যা বেশি।
বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলায় এটিই সবচেয়ে বড় ছাগলের হাট। এখানে সপ্তাহের শনি ও বুধবার ছাগলের হাট বসে। দ্রুত প্রজননশীলতা, উন্নত মাংস, মাংসের ঘনত্ব ও উন্নতমানের চামড়ার জন্য ব্লাকবেঙ্গল ছাগল বিশ্ববিখ্যাত। ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল গট’ (কালো ছাগল) জাতের ছাগল কিনতে ভিড় বেড়েছে মেহেরপুরের সদর উপজেলার বারাদি হাটে। স্বাদে-গুণে ভালো হওয়ায় এই ছাগলের কদর বাড়ছে দিন দিন। প্রতিবারের মতো দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা ব্লাক বেঙ্গল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন এই হাট থেকে। কোরবানীর পশু হিসেবে চাহিদা বেশী ব্লাক বেঙ্গলের। এবছর মেহেরপুর জেলায় ১ লাখ ২৬ হাজার কোরবানীর জন্য ব্লাক বেঙ্গল প্রস্তুত বলে জানিয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ। ব্যবসায়ীরা জানান, দাম নাগালের মধ্যে থাকায় এবার এই ছাগলের চাহিদা যেমন বেড়েছে, তেমনি লাভবান হচ্ছেন তারা।
ব্লাক বেঙ্গল পালনে দেশের প্রথম স্থানে আছে মেহেরপুর জেলা। জাতিসংঘের ফুড এ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও) ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তির মূল্যায়নে বাংলাদেশের ব্লাক বেঙ্গল গট বিশে^র অন্যতম সেরা জাত হিসেবে বিবেচিত। অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে এ ছাগল ‘কুষ্টিয়া গ্রেড’ হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলা ব্্রান্ড হিসেবে বেছে নিয়েছে ব্লাক বেঙ্গলকে। মূলত বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও তার আশপাশের জেলায় এ ছাগলের পালন বেশি হয় বলে এ নামকরণ করা হয়।
বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায়, বিশে^র যে পাঁচটি দেশে দ্রুত হারে ছাগল উৎপাদন বাড়ছে বাংলাদেশ তার অন্যতম। মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও আশপাশের তিন জেলায় ব্লাক বেঙ্গল পালন বেশী হয়ে থাকে। এ ছাগলগুলো স্বতন্ত্র জাতের। ঘরে ঘরে পালন হয় বিধায় এসব ছাগল টিকে আছে। বর্তমানে  শংকরায়ন কারণে জাতটি হারিয়ে যাবে বলে আশংকা করছেন জেলা প্রাণি সম্পদ বিভাগ।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, দেশের স্থানীয় জাত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল মানের দিক থেকে বিশ্বসেরা হিসেবে স্বীকৃত। এবার কোরবানীর জন্য উপযোগী করা ছাগলের ৯০ শতাংশই ব্লাক বেঙ্গল জাত। জেলার প্রায় প্রতিটি পরিবারে ব্লাক বেঙ্গল পালন হয়। জেলায় ৫৩০টি খামারসহ মেহেরপুরে ১ লাখ ৬ হাজার পরিবারে ছাগল পালন হচ্ছে। এর মধ্যে এবার কোরবানীর জন্য ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ৯৫ হাজারসহ ১লাখ ২৬ হাজার ছাগল কোরবানী উপযোগী। ছাগলের চাহিদা থাকায় মেহেরপুর জেলার পশু হাট থেকে ট্রাক ভর্তি করে ছাগল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের উত্তর-পূর্ব জেলাগুলোতে নেওয়া হয়।
সরেজমিনে সদর উপজেলার বারাদী ছাগলের হাটে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল জায়গাজুড়ে কালো ও ধূসর রঙের ছাগলের বাহার। এর মধ্যে মাথায় শিংহীন মাঝারি আকারের ছাগলের সংখ্যা বেশি। কয়েক হাজার ছাগল হাটে উঠেছে। শত শত বেপারি বাইরে থেকে ছাগল কিনতে গেছেন। অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ছাগলগুলোর ডাকচিৎকারও কম। এ কারণে ৫০টি ছাগলের দড়ির বাঁধন নিয়ন্ত্রণ করছেন একজনই।
বাজারে ছাগল বিক্রি করতে আসা গৃহস্থ ও ব্যবসায়িরা জানান, মেহেরপুরের ব্লাক বেঙ্গলের মাংস যেমন ঘনত্ব, তেমনি সুস্বাদু ও এই ছাগলের চামড়া ও হাড় হয় বড়ই উন্নত মানের। চামড়া দিয়ে ব্যবহার্য্য দামি পণ্য তৈরি হয়। তাই চামড়াও বিক্রি হয় চড়া দামে। তারা জানান, এ ছাগল খাদ্য হিসেবে নেপিয়ার ঘাস, ধান গমের গুঁড়ো, কাঁঠালপাতা খেয়ে থাকে।
বৃহৎ বারাদি হাটসহ ছোট-বড় মিলিয়ে ২৭টি ছাগলের হাট রয়েছে এ জেলায়। কোরবানীর সময় ২০ হাজার থেকে ৪০-৫০ হাজার টাকা দামেরও ছাগল পাওয়া যায় এ সমস্ত হাটে। ছাগল বিক্রি করতে আসা সদর উপজেলার আমঝুপি গ্রামের জাহিদ হোসেন জানান, এবার ২০টা ছাগল বিক্রি করবেন হাটে। প্রতি ঈদে তিনি নিজ বাড়িতে পালন করা ছাগল বিক্রি করেন।
চট্টগ্রাম থেকে ছাগল কিনতে আসা ব্যাপারী রফিকুল হক জানান, এ জেলার ছাগলের মাংসের স্বাদ এবং গন্ধ একেবারেই ভিন্ন। তাই চাহিদাও বেশি। লাভও ভালো হয়। এবার ব্লাক বেঙ্গল জাতের এক হাজার ছাগল কেনার ইচ্ছের কথা জানান তিনি। হাটে ব্যতিক্রম দেখা গেল অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভেড়া। কিন্তু গলায় কোন রশি নেই। একদল ভেড়ার মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, বড় ভেড়াটিকে ধরে রাখলেই তাকে ঘিরে থাকে অন্য ভেড়ারা। তিনি হারিয়ে গেলেও ভেড়ারা রশির ভেড়াকে ঘিরে অবস্থান করবে। এটা ভেড়ার সহজাত ধর্ম।
বারাদি হাটের ইজারাদার ইস্রাফিল হোসেন জানান, ঈদ সামনে রেখে শুধু এই হাট থেকেই এবার ৬০ হাজার ছাগল বিক্রির টার্গেট রয়েছে। প্রতি হাটে অন্তত ৩ হাজার ছাগল বিক্রি হয়।
আলমপুর গ্রামের ছাগলের বেপারী কমর উদ্দিন ৪০ কেজি করে দুটিতে দুইমণ মাংস হবে এমন খয়েরি রংয়ের দুটি ছাগল হাটে তুলেছেন। ছাগল দুটি ঢাকার বেপারী রুহুল আমীনের কাছে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। ওই ব্যাপারী জানান- মাংসের হিসেব করে ছাগল দুটি কেনা হয়নি। কোরবানীতে এমন ছাগলের চাহিদার কারণেই তিনি কিনেছেন। একেকটি ছাগল চিটাগাং বাজারে অন্তত ৪২ থেকে ৪৫ হাজার টাকা করে বিক্রির আশা প্রকাশ করছেন তিনি।
জেলা প্রাণিীসম্পদ কর্মকর্তা মো; সাইদুর রহমান জানান- প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ব্লাক বেঙ্গল জাতের ছাগল পালনকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ছাগল দুই বছরে ৩ বার বাচ্চা প্রসব করে। একেকবার ৪টি পর্যন্ত বাচ্চা প্রসব করে। জেলায় ছোট বড় মিলে ৫৩০টি খামার বাণিজ্যিকভিত্তিতে ছাগল পালন করছে। মেহেরপুরের শতকরা ৪৫ ভাগ পরিবার ১টি করে ছাগল পালন করে নিজেদের দুঃসময়ে আপদকালীন অর্থনৈতিক সমস্যা চাহিদা মেটাতে ছাগল পালন করে।  এ কর্মকর্তা আরও জানান- এবার ১ লাখ ২৬ হাজার ছাগল কোরবানীর পশু হিসেবে প্রতিটি ১৭ হাজার টাকা করে হলেও ২১৫ কোটি টাকার বেচা কেনা হবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন