শিরোনাম

সাতক্ষীরা, ২৯ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : দূর থেকে দেখলে মনে হবে সবুজ পাতার ছায়ায় মাঁচায় ঝুলছে রঙিন ফলের মালা। কাছে গেলে বোঝা যায়, এগুলো অসময়ের তরমুজ। মাঁচার নীচে অন্যান্য ফসল, মিঠে ও লোনাপানির মিশ্র ঘেরে মাছের খেলা। আর ওপরে মাঁচায় ঝুলছে সুপ্রিম হানি, তৃপ্তি, ব্ল্যাক বেবি, সুগারকুইন আর বাংলা লিংক নামের তরমুজ। এ যেন মন ভোলানো দৃশ্য এখন সাতক্ষীরার কৃষকের মাঠে নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। স্বল্প খরচে দাম বেশি পাওয়ায় অসময়ের এসব তরমুজ চাষে আগ্রহ বাড়ছে সাতক্ষীরার কৃষকদের মাঝে।
জেলা কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৭টি উপজেলায় অসময়ের এ তরমুজ এবার প্রায় ১৪১ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। যা গতবারের তুলনায় প্রায় ৬৫ হেক্টর জমিতে বেশি চাষাবাদ হয়েছে।
এটি একটি লাভজনক ফসল। প্রতি বিঘা সমতল জমিতে তরমুজ চাষে খরচ হয় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা।
যা বিক্রি হয় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত। কয়েক বছর আগেও সাতক্ষীরা সদর, তালা, দেবহাটাসহ বিভিন্ন উপজেলার অনেক জমিই ছিল পতিত। এছাড়া মৎস্য ঘেরের বেঁড়িবাধগুলো ছিল অব্যবহৃত, নয়তো আগাছায় ভরা।
কৃষি বিভাগের উদ্যোগে সেই সব জমিতে শুরু হয় পরীক্ষামূলক তরমুজ চাষ। প্রথমে অনেকে সন্দিহান ছিলেন, লোনাপানির প্রভাবে কি তরমুজ হবে? তবে প্রথম ফসলেই মিলল সাফল্য। সেই সাফল্য ছড়িয়ে পড়লো আশপাশের গ্রামগুলোতে। অসময়ের তরমুজ চাষ শুধু কৃষকের ভাগ্যই বদলাচ্ছে না, পতিত জমি ও লোনাপানি নিয়েও কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যে এ মডেল সাতক্ষীরার গন্ডি পেরিয়ে দেশের অন্য উপকূলীয় অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ঠরা।
তালা উপজেলার তেতুলিয়া এলাকার কৃষক ইকবাল হোসেন বাসস’কে জানান, মালচিং পদ্ধতিতে অসময়ের তরমুজ চাষ করে আশানুরুপ ফলন হয়েছে। আস্থা, কানিয়া ও ড্রাগন প্লাস জাতের তরমুজ চাষ করেছেন তিনি।
ফলন অনেক ভালো, বাজার দরও ভালো। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে পাইকারি ব্যবসায়ীরা আসেন।
তারা এখান থেকে তরমুজ কিনে নিয়ে যান। এবার অনেক লাভবান হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই চাষী।
তরমুজের খামারের কর্মচারী আকছেদ আলী জানান, অসময়ের এসব তরমুজের ভিতরটা হলুদ ও লাল যে রঙেরই হোক না কেন, খেতে খুবই সুস্বাদু। আগে এলাকায় কাজ পাওয়া যেত না, এখন আমাদের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতিদিন ৫শ’ টাকা মজুরি পাই। ফলে আমাদের আর কাজের জন্য বাইরে যাওয়া লাগে না।
একই এলাকার তরমুজ চাষী শিরিনা বেগম জানান, স্থানীয় বেসরকারী সংস্থা ‘উন্নয়ন প্রচেষ্টা’ থেকে তরমুজের বীজ ও সার দিয়ে সহায়তা করায় তিনি এবার ২ বিঘা জমিতে হলুদ রঙের অসময়ের তরমুজ চাষ করেছেন।
ফলনও ভালো হয়েছে। তার বাগানের তরমুজ তিনি নিজেই মহাসড়কের ধারে বসে বিক্রি করেন। ২ বিঘা জমিতে সব খরচ বাদে সর্বনিম্ন এক লাখ থেকে সর্বোচ্চ দেড় লক্ষাধিক টাকা লাভ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন প্রচেষ্টার কৃষিবিদ নয়ন হোসেন বাসস’কে জানান, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর সহযোগিতায় এবং উন্নয়ন প্রচেষ্টার এসপিডি এগ্রিকালাচারাল এর আওতায় সাতক্ষীরার জেলার তালা উপজেলার তেতুলিয়া ইউনিয়নে ২১ জন কৃষক ২৮ বিঘা জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে অফসিজনের এ তরমুজ চাষ করেছেন। আমরা উন্নয়ন প্রচেষ্টার পক্ষ থেকে এখানে বীজ, জৈব সার, জৈব কীটনাশকসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরামর্শ প্রদান করেছি। ব্যাপক ফলনও হয়েছে। কৃষকরা পাইকারি এ তরমুজ কেজি প্রতি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা বিক্রি করছে। যেভাবে ফলন এবং লাভ হচ্ছে, তাতে আগামীতে আরো ব্যাপকহারে অসময়ের তরমুজ চাষাবাদ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সাতক্ষীরার মাটি তরমুজ চাষের জন্য বেশ উপযোগী বলে তিনি আরো বলেন, দেশের উর্বর মাটিকে ব্যবহার করে কৃষকরা ফসল ফলিয়ে সচল রেখেছে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি। ফলে চাকরির পেছনে বৃথা সময় ব্যয় না করে যদি কৃষিকাজে শিক্ষিত তরুণরা এগিয়ে আসেন, তাহলে নিজে স্বাবলম্বী হবে এবং দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
তালার বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন প্রচেষ্টা’র নির্বাহী পরিচালক মো. ইয়াকুব আলী বাসস’কে বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে আমরা দারিদ্র বিমোচন ও বিভিন্ন আয়মুখী কর্মসুচি দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। সমাজের অবহেলিত মানুষ যাতে নতুন নতুন কর্ম করে তাদের জীবন চালাতে পারে এবং তারা যাতে আয় করতে পারে নতুন ফসল উৎপাদন করে এ লক্ষ্যে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, আমরা অন্যান্য কাজের পাশাপাশি এ অসময়ের বেবী তরমুজ চাষে কৃষকদের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা করে আসছি। আর তরমুজ চাষ করে তারা অনেক লাভবান হচ্ছে। প্রতি বিঘায় তারা অল্প সময়ের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লাভ করছে। উন্নয়ন প্রচেষ্টা থেকে কৃষক প্রতি ১৫ হাজার টাকা দেয়া হয় এবং বাকি খরচ তারা নিজেরা করে থাকে। এছাড়া সিজোনাল লোনও দেয়া হয় তাদের। যার ইন্টারেষ্ট খুব কম।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ি সাতক্ষীরার অতিরিক্ত উপ পরিচালক (শস্য) কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ বাসস’কে বলেন, বর্তমানে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ সাতক্ষীরা জেলায় অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। ২০২০ সাল থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় প্রথমে জিকেবিএসপি, পরবর্তীতে এসএসসিপি ও সর্বশেষ সিসিইপি প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে আমরা অসময়ের এ মাঁচা পদ্ধতির তরমুজের বীজ দেই। একই সাথে উন্নতমানের বীজ ও সারের পাশাপাশি মাঁচা তৈরির জন্য উপকরণ দিয়ে থাকি। এরই ধারাবাহিকতায় কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হয়ে জেলায় এবার প্রায় ১৪১ হেক্টর জমিতে এই গ্রীষ্মকালীন তরমুজ উৎপাদন করছে। এ তরমুজ অত্যন্ত সুমিষ্ট ও সুস্বাদু। এর বাজারমূল্য কৃষক পর্যায়ে ভালো পেয়ে থাকেন বলে এটি উৎপাদনের চাহিদা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিধপ্তর উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে এবং উপসহকারীদের মাধ্যমে এ বিষয়ে পরামর্শসহ উন্নতমানের বীজ সরবরাহের পাশাপাশি বেশকিছু প্রদর্শনী কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
অসময়ের এ তরমুজের মধ্যে সুপার কিং, তৃপ্তি, ব্লাক বেরি এবং ইয়োলো বোর্ড অন্যতম।