শিরোনাম

দিনাজপুর, ১৩ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : দিনাজপুর জেলা ও দায়রা জজ মো. আলমগীর কবীর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে বলেছেন, অধিকার আদায়ে নিজেদের সচেতন ও দক্ষ করে তুলতে হবে।
গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ১১টায় দিনাজপুর জেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সভাপতি চিত্ত ঘোষ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য বাসস’কে নিশ্চিত করেন।
প্রেরিত বার্তায় জানানো হয়, গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৮টায় থেকে রাত সাড়ে ১০টা পযন্ত দিনাজপুর জেলায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, দলিত ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আইনি সহায়তা সহজলভ্য করার লক্ষ্যে সভা অনুষ্ঠিত করা হয়।
সভায় দিনাজপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অধীনস্থ বিচারকগণের সাথে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি’র বক্তব্যে জেলা ও দায়রা জজ মো. আলমগীর কবীর এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বৈষম্যহীন চিন্তা-ভাবনা ও আইনের কোন ব্যত্যয় না ঘটিয়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগ কাজ করে যাচ্ছেন। আমি নিজে জেলা ও দায়রা জজ এবং অতিরিক্ত দায়িত্বে জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে আইনি সেবা দেয়ার কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, নিজেদের অধিকার আদায়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিজেদের দক্ষ ও শিক্ষিত হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। আদালতে বিচারাধীন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিত জনগোষ্ঠীর মামলা গুলো তালিকা ভুক্ত করে বিশেষ নজর দেয়া এবং আইনের ব্যত্যয় না ঘটিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা হেকস-ইপার আয়োজনে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের শহীদ সোহেল-জগন্নাথ সম্মেলন কক্ষে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
জেলা ও দায়রা জজ কবীর তার বক্তব্যে বলেন, সমাজের কোন মানুষ পিছিয়ে থাকবে, রাষ্ট্র এমনটি চায় না। তাই প্রান্তিক, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, দলিতসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র আইনগত সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষ যেন আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, সেজন্য সরকারি লিগ্যাল এইড, ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য আইনি সহায়তা এখন একটি অধিকার। ‘যাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই, তারা সরকারি খরচে জেলা লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় আইনি সেবা নিতে পারবেন। এ বিষয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
‘তিনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিত জনগোষ্ঠীসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, আইনজীবী ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধিদের সাথে পৃথকভাবে মতবিনিময় করার পরামর্শ দেন।
হেকস-ইপার বাংলাদেশের পার্টনারশিপ ম্যানেজার ও সিনিয়র প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজার সাইবুন নেসার সভাপতিত্বে এবং হেকস-ইপার টেকনিক্যাল কর্মকর্তা পাপন কুমার সরকারের উপস্থাপনায় সভার ধারণা পত্র উপস্থাপন করেন মৌমিতা জাহান।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, স্পেশাল জজ প্রদীপ কুমার রায়, নারী নির্যাতন দমন আদালতের বিচারক মো. হুমায়ুন কবির সরকার, শিশু সহিংসতা অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মোস্তফা কামাল, ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক খন্দকার এ.টি.এম. তোফায়েল, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফিরোজ কবির, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, ফাতিমা খাতুন, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ইসরাফিল আলম, সিনিয়র সিভিল জজ মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জয় কিশোর নাগ, জেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সভাপতি চিত্ত ঘোষ এবং প্ল্যাটফর্মের উপদেষ্টা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সফিকুল হক ছুটু।
উন্মুক্ত আলোচনায় বক্তব্য রাখেন, গবেষক আব্দুল্লাহ আল মামুন, শুভাশীষ মহন্ত, জেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সাধারণ সম্পাদক আলবিনুস টুডু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রঙ্গলাল বাসফোর, সদর উপজেলা প্ল্যাটফর্মের সাধারণ সম্পাদক শিউলী বাড়া, জেলা প্ল্যাটফর্মের সদস্য রিপন মার্ডি, ফুলবাড়ী উপজেলা প্ল্যাটফর্মের সাধারণ সম্পাদক কমল কিস্কু, বীরগঞ্জের এ্যাডোয়ার্ড মেহরম, পিয়ুস মুরমু, কাহারোলের মারিয়া মুরমু, পার্বতীপুরের অজয় বাসফোর, রংপুরের মঞ্জুশ্রী সাহা এবং ঠাকুরগাঁও জেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সদস্য অ্যাডভোকেট ইমরান চৌধুরী।
উন্মুক্ত আলোচনায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে জমি ও কবরস্থান দখল, বৈষম্যের শিকার হওয়া এবং নিজেদের পরিচয় ও অধিকার নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। একই সাথে তারা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষকে নিজস্ব পরিচয়ে পরিচিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষ অতিথিরা বলেন, নিজেদের অধিকার আদায়ে নিজেদের শিক্ষিত ও সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা ও সচেতনতা থাকলে অনেক সমস্যার প্রাথমিকভাবে সমাধান নিজেরাই করতে পারবেন। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জমি দখলের চেষ্টা করলে, ভবিষ্যতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ঘটনাটি ভিডিও করে রাখা যেতে পারে। তবে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে, আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা বলেন, কোন বিষয়ে মামলা করার প্রয়োজন হলে, প্রথমে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তিদের সরকারি খরচে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অধিকার আদায়ে ভয় বা সংকোচ না করে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহায়তা নেয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সভায় বক্তারা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিত জনগোষ্ঠীর মানুষের ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সামাজিক সংগঠন গুলোর মধ্য সমন্বয় ও যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ সময় হেকস-ইপার এর পক্ষ থেকে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. আলমগীর কবীরকে ক্রেস্ট প্রদান করেন পার্টনারশিপ ম্যানেজার ও সিনিয়র প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজার সাইবুন নেসা এবং জেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সভাপতি চিত্ত ঘোষ।
পরে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ জেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সভাপতি চিত্ত ঘোষ, আদিবাসী সংগ্রামী নারী রেখা হাসদা এবং জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ইসরাফিল আলমকে হেকস-ইপার পক্ষ থেকে ক্রেস্ট প্রদান করেন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. আলমগীর কবীর।
মতবিনিময় সভায় জেলার সকল বিচারক, জেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সদস্য, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, মূলধারার প্রতিনিধিসহ সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।