শিরোনাম

গাজীপুর, ২ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুল ও অপতথ্যের বিস্তারের এই সময়ে বস্তুনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল ও নৈতিক সাংবাদিকতা চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন দেশের শীর্ষ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।
তারা বলেন, সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য-উৎস বারবার যাচাই, পেশাগত নীতি-নৈতিকতা অনুসরণ এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিকল্প নেই।
গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও ওয়ার্ল্ড ভিশনের যৌথ উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আজ রোববার অনুষ্ঠিত ‘মৌলিক সাংবাদিকতা ও নৈতিক প্রতিবেদন’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
কর্মশালায় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মো. কামাল উদ্দিন সবুজ বলেন, সাংবাদিকতা যেমন একটি বন্ধুর পথ, তেমনি নীতি-নৈতিকতার মধ্যে থেকে কাজ করাও সমান কঠিন। রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে নতি স্বীকার না করে গণমাধ্যমকে সবসময় জনস্বার্থ ও সত্যের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে।
তিনি শিশু অধিকার রক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে সাংবাদিকদের সংবেদনশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধে গণমাধ্যমকে আরও সোচ্চার হতে হবে। তিনি শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্য ও নীতি বজায় রেখে সংবাদ পরিবেশন করার আহ্বান জানান।
প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ভুল ও অপতথ্যের যুগে সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, ‘এই এআই-এর যুগে আমরা দেখছি যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের তথ্য প্রচারিত হয়। এর মধ্যে কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা আর কোনটা অপতথ্য, সেটি নিশ্চিত করাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই সাংবাদিকদের যেকোনো সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য-উৎস বারবার যাচাই-বাছাই করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। সমাজের প্রতি সাংবাদিকদের বড় ধরনের দায়বদ্ধতা রয়েছে। ‘ফাইভ ডব্লিউ, ওয়ান এইচ’ (কী, কেন, কোথায়, কখন, কে এবং কীভাবে)-এর মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ করে সংবাদ প্রস্তুত ও সম্পাদনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তথ্যের সঠিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখাই পেশাদার সাংবাদিকতার মূল শক্তি।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, সাংবাদিকতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পেশা। ভবিষ্যতে তথ্য কমিশনের নতুন রূপরেখা ও আইনগত কঠোরতা আসতে পারে, তাই সাংবাদিকদের আইন ও নীতি-নৈতিকতার বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে ভুয়া খবর ও গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ অনেক সময় তথ্য যাচাই বা ফ্যাক্ট-চেক না করেই বিভ্রান্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনই সাংবাদিকদের প্রধান দায়িত্ব। তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য না নিয়ে বা একতরফা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি না করার পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্র ও ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করা এবং তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এটি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, জনগণের অধিকার রক্ষা করে এবং সমাজে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, ‘সত্য বলার সাহসিকতাই সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র। গণমাধ্যমের জন্য প্রয়োজন সৎ, সত্যনিষ্ঠ ও পক্ষপাতমুক্ত সাংবাদিকতা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জায়গা ক্রমেই স্বার্থনির্ভর সাংবাদিকতা দখল করে নিচ্ছে।’
দলবাজি, অপসাংবাদিকতা, হলুদ সাংবাদিকতা ও তথ্যসন্ত্রাস সাংবাদিকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি আদর্শ গণমাধ্যম কোনো দল, গোষ্ঠী, সরকার, বিদেশি রাষ্ট্র বা এজেন্সির কাছে দায়বদ্ধ নয়; তাদের দায়বদ্ধতা কেবল জনগণের কাছে। গণমাধ্যমের পরাজয় মানে জনগণের পরাজয়, আর জনগণের পরাজয় মানে রাষ্ট্রের পরাজয়।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, অতীতে সাংবাদিকদের ওপর নেমে আসা দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের নানা ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে গণমাধ্যমকে সব ধরনের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে জনগণের প্রকৃত কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
কর্মশালায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।