বাসস
  ১৯ জুন ২০২৬, ১৭:৩৬
আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ১৭:৪০

দুই বছর বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালু হচ্ছে সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর

ছবি : বাসস

মো. আয়নাল হক

রাজশাহী, ১৯ জুন, ২০২৬ (বাসস) : দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর অবশেষে পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হবে।

সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালুর লক্ষ্যে গত ১৬ জুন একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম বজলুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন।

সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), নৌ-পুলিশ, অন্যান্য সরকারি দপ্তর এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

নৌ-পুলিশের অতিরিক্ত সুপার ফজলে এলাহী জানান, বন্দরটি চালু হলে সেখানে একটি নৌ-থানা স্থাপন করা হবে। বর্তমান ফাঁড়িটিকে পূর্ণাঙ্গ থানায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এনবিআর প্রতিনিধিরা জানান, আগে বন্দরের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা নিয়ে কিছু উদ্বেগ ছিল। তবে এখন প্রয়োজনীয় সব স্থাপনা তৈরি এবং প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। এ বিষয়ে শিগগিরই একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

পাথর আমদানিকারক আমিনুল ইসলাম বলেন, সড়কের চেয়ে নদী পথে পণ্য আনা নেওয়ায় খরচ কয়েকগুণ কম হয়। ভারতের মায়া বন্দর থেকে পাথর নিয়ে আসলে খরচ অর্ধেকের নিচে নেমে আসবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হবেন। 

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হাসেন আলী বলেন, সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালু হলে রাজশাহী অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা বেশ উপকৃত হবেন। সোনামসজিদ বন্দরের পাশাপাশি এই বন্দর ব্যবসায়ীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে। শুধু আমদানি নয়, এই বন্দর দিয়ে রপ্তানিও করা যাবে। এতে আমাদের কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে।

গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান জানান, বন্দরের সংযোগ সড়কটি প্রশস্ত করার কাজ চলছে। বন্দর পরিচালনার অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও শেষ হয়েছে। ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে পণ্য মজুদের জন্য আশপাশের জমি ভাড়া নিতে শুরু করেছেন। 

বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, নৌযান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে পদ্মা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজিং করার পাশাপাশি নতুন অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে। এনবিআরের অনুমোদন পেলেই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা যাবে।

রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম বজলুর রশীদ বলেন, বন্দরটি চালু হলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটবে। বন্দরটি পুনরায় চালুর বিষয়ে শিগগিরই ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এর আগে, গত শুক্রবার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের সদস্য (পরিকল্পনা ও পরিচালন) ও যুগ্ম সচিব সাজেদুর রহমান সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর পরিদর্শন করেন। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিআইডব্লিউটিএ-এর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন।

প্রায় ছয় দশক আগে রাজশাহীর সুলতানগঞ্জ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের মধ্যে নিয়মিত নৌ-বাণিজ্য চালু ছিল। তবে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে এই নৌপথটি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৫৯ বছর পর ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এই নদীপথে পুনরায় বাণিজ্য শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র ১০ দিন চালু থাকার পর বন্দরটি আবার বন্ধ হয়ে যায়।

ওই অল্প সময়ে পাঁচটি নৌযানের মাধ্যমে পাথর আমদানি এবং পোশাক খাতের বর্জ্য (ঝুট) রপ্তানি করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন বন্দরটি পরিদর্শন করেন এবং এটি দ্রুত পুনরায় চালু করার নির্দেশ দেন। তবে সে সময় সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হয়নি।

গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ থেকে ভারতের মুর্শিদাবাদের মায়া নদীবন্দরের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। এই রুটটি চালু হলে ভারত থেকে পাথর, মার্বেল, খনিজ বালু, সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী আমদানি করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, মাছ, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং বিভিন্ন কৃষি সামগ্রী রপ্তানি করা যাবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরটি পুনরায় চালু হলে রাজশাহী অঞ্চলের বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক নতুন গতি সঞ্চার হবে।