শিরোনাম

খুলনা, ১৬ জুন, ২০২৬ (বাসস): বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, বর্তমান সরকার দেশের অপার সম্ভাবনাময় সমুদ্র সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুযোগ্য নেতৃত্বে আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত সুনীল অর্থনীতির সকল কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
মন্ত্রী আরো বলেন, এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন করার লক্ষ্যে সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রভিত্তিক শিল্প প্রযুক্তির উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং সমুদ্রে পরিবেশ সংরক্ষণ, গবেষণা এবং উদ্ভাবনে গুরুত্বারোপ করা হবে।
আজ খুলনা শিপইয়ার্ডে বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিওআরআই) জন্য দেশে নির্মিতব্য প্রথম আন্তর্জাতিক মানের সামুদ্রিক গবেষণা জাহাজের একটি ‘স্মল রিসার্চ ভেসেল’ এর আনুষ্ঠানিক কিল লেয়িং এবং গবেষণা জাহাজটির মুরিং সহায়তার জন্য নির্মিতব্য ১টি সেলফ সাসটেইন্ড পন্টুনের কিল লেয়িং অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ফকির মাহবুব আনাম।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, আজকের অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের সামুদ্রিক গবেষণার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।
তিনি বলেন, একটি গবেষণা জাহাজের কিল লেয়িং সেরেমনি হচ্ছে জাহাজ নির্মাণের প্রাথমিক ধাপ। এই ভিত্তিপ্রস্তর বাংলাদেশের সমুদ্রবিজ্ঞান, সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান, ব্লু ইকোনমি এবং টেকসই উন্নয়নের ভবিষ্যৎ যাত্রার দৃঢ় ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যই ছিল দেশের সামুদ্রিক সম্পদ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বৃদ্ধি করা এবং সেই জ্ঞানকে জাতীয় উন্নয়নের কাজে লাগানো।
তিনি বলেন, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ, উপকূলীয় ইকোসিস্টেম, সামুদ্রিক দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন।
মন্ত্রী বলেন, তবে আমরা সবাই উপলব্ধি করি যে আন্তর্জাতিক মানের সামুদ্রিক গবেষণার জন্য একটি নিজস্ব আধুনিক গবেষণা জাহাজ দীর্ঘদিনের প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজন পূরণের পথে আমরা একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।
তিনি বলেন, নতুন গবেষণা জাহাজ সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক জীবপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পর্যটনসহ সমুদ্রকেন্দ্রিক বিষয় সমূহের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি আমাদের তরুণ গবেষকদের জন্য একটি কার্যকর প্রশিক্ষণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সামুদ্রিক গবেষণায় আরো শক্তিশালী অবস্থান অর্জন করবে।
সাগরের নিচে সামুদ্রিক সম্পদের প্রাচুর্যতার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সাগরের নিচে এতো খনিজ সম্পদ রয়েছে এটিকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। আর সে গবেষণার জন্যই আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা আমাদের সক্ষমতায় এই জাহাজ নির্মাণ হতে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের জন্য গৌরবের।
তিনি বলেন, জাপানিরা সমুদ্রের তলদেশ হতে অনেক সামুদ্রিক খাবার আহরণ করছে। আমরাও যদি সমুদ্রের নিচে যাই, গভীরে যাই— তাহলে খাদ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, নতুন করে আরো মডার্ন ফিশিং শীপকে অনুমতি দেওয়া হবে। সমুদ্র আজ কেবল খাদ্যের উৎস নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সুনীল অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক জীবপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে এর বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বৈজ্ঞানিক রিসার্চ ভেসেল-এ জানতে পারবো আমাদের সমুদ্র সীমানার মধ্যে কোথায় মাছের বসবাস।
মন্ত্রী বলেন, সমুদ্রের গভীরে কী আছে, কোন প্রজাতির জীব কোথায় বাস করে, কী ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তন ঘটছে, কোন সম্পদ ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার জন্য অত্যাধুনিক গবেষণা অবকাঠামো প্রয়োজন। গবেষণা জাহাজ সেই অবকাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
মন্ত্রী জাহাজ নির্মাণ শিল্পে দেশের সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতার মাধ্যমে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা জাহাজ নির্মাণের উদ্যোগ ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ সক্ষমতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি আমাদের আত্মবিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করবে এবং প্রমাণ করবে যে, বাংলাদেশ এখন শুধু জাহাজ ব্যবহারকারী দেশ নয়, বরং জাহাজ নির্মাণেও একটি সক্ষম ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে এই গবেষণা জাহাজের নির্মাণকাজ সম্পন্নের নির্দেশ দেন তিনি। এটি বাংলাদেশের সামুদ্রিক গবেষণার একটি নতুন যুগের সূচনা করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন মন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কমডোর মো. মিনারুল হক।
এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়ার এডমিরাল একেএম জাকির হোসেন।
সভায় খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মো. আব্দুল্লাহ হারুন, জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই)-এর বিজ্ঞানী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, প্রকৌশলী, নৌ-প্রযুক্তিবিদ, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ১০ ফেব্রুয়ারি খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড ও বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মধ্যে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির আওতায় একটি নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট(বিওআরআই)-এর জন্য ১টি স্মল রিসার্চ ভেসেল ফর স্যাম্পল কালেকশন, ১টি সেলফ সাসটেইন্ড পন্টুন নির্মাণ করবে। গবেষণা জাহাজ ও পন্টুনের কিল লেয়িংয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।