বাসস
  ১১ জুন ২০২৬, ১৮:০২

নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে নামছেন জেলেরা, কয়েকলাখ টন ইলিশ আহরণের প্রত্যাশা

ছবি : বাসস

 আল-আমিন শাহরিয়ার

ভোলা, ১১ জুন, ২০২৬ (বাসস) : দীর্ঘ ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ বৃহস্পতিবার দিনগত রাত শুক্রবার (১২ জুন) থেকে আবারও সাগরে মাছ শিকারে নামছেন ভোলা উপকূলের জেলেরা। 

মা ইলিশ ও সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ রক্ষায় গত ১৫ এপ্রিল  থেকে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। অবরোধের এই দীর্ঘ সময়ে জাল বোনা আর ট্রলার মেরামতের কাজ শেষ করে এখন সাগরে যাওয়া শুরু করবেন জেলেরা। মৎস্য বিভাগ আশা করছে, অভিযান সফল হওয়ায় এবার সাগরে মিলবে কাক্সিক্ষত ইলিশ, যার পরিমাণ কয়েকলাখ টন ছাড়িয়ে যেতে পারে। 

এদিকে দীর্ঘ দিনের নীরবতা ভেঙে আবারও উৎসবমুখর হতে চলেছে ভোলা উপকূলের জেলেপাড়াগুলো। বুকভরা আশা আর নতুন স্বপ্ন নিয়ে সমুদ্রে যাত্রা শুরু করেছেন জেলেরা। নিষেধাজ্ঞার এই দিনগুলোতে সাগরে যাওয়া বন্ধ থাকলেও হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না জেলেরা। জাল মেরামত, ট্রলার রং করা আর ইঞ্জিন জোড়াতালির কাজ সেরেছেন এই সময়ে। তবে পেটের তাগিদ আর ঋণের বোঝা যাদের নিত্যসঙ্গী, তাদের আনন্দ ছিলো অনেকটাই ম্লান। সরকারিভাবে যে চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তা চাহিদার তুলনায় সামান্য বলে অনেক জেলে জানান। শুধু সাধারণ জেলেই নন, লোকসানের বৃত্তে বন্দি ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরাও। 

জেলেরা বলছেন, বৈরী আবহাওয়া আর পরপর নিষেধাজ্ঞার কারণে চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত আসল পুঁজিই তুলতে পারেননি তারা। তবে এবার কাক্সিক্ষত ইলিশের দেখা মিলবে,এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

মৎস্য বিভাগ বলছে, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া ভোলায় এবারের অভিযান সফল হয়েছে। আর এর সুফল হিসেবে ইলিশের উৎপাদন গতবারের চেয়ে অনেকগুণ বাড়বে বলে প্রত্যাশা তাদের।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঋণের বোঝা আর বরাদ্দের স্বল্পতা-সব কষ্ট ভুলে জেলেরা এখন মাছধরার আশায় বিভোর। সব বাঁধা পেরিয়ে সাগরে এবার ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়বে এবং উপকূলের অর্থনীতিতে আবারও সুদিন ফিরবে, এমনটাই আশা করছেন এ অঞ্চলের লাখো মৎস্যজীবী।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও মৎস্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বঙ্গপোসাগর থেকে আহরণ করা মাছের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬.২৯ লাখ মেট্রিক টন।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সেভ আওয়ার সি’ তথ্য অনুসারে, প্রতিবছর বঙ্গোপসাগর থেকে আশি লাখ টন মাছ ধরা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জেলেরা ধরতে পারছেন মাত্র ৭ লাখ টন মাছ।

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার শামরাজ মৎস্য বন্দরের সাগরগামী ট্রলার মালিক আব্দুর রশিদ, ছালে আহাম্মদ, আবুল কালাম ও জাকির হোসেন মাঝির সাথে কথা হয়। 

তারা বলেন,‘আমরা সাগরে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাছ বেশি ধরি। ইলিশ মৌসুমে যেমন ইলিশ বেশি ধরা হয়। এছাড়া সাগরের অন্যসব মাছও আমরা ধরি। কিছু মাছ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়ে যায়, কিছু আবার শুঁটকি করে রপ্তানি করে থাকি।

তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের জেলেরা দক্ষিণে মিয়ানমারের সীমানা আর পশ্চিমে ভারতের সীমানা পর্যন্ত গিয়ে মাছ ধরে। বাংলাদেশের সমুদ্র থেকে লাক্ষা, রূপচাঁদা ও কালোচাঁদা, টুনা, ম্যাকারেল, লইট্টা, চ্যাপা, সামুদ্রিক রিঠা, শাপলা পাতা মাছ, তাইল্লা, পোয়া, সুরমা, ইলিশ, বদর ছুরি, ফাইস্যা, সামুদ্রিক বাইন ও জবা কই মিলিয়ে প্রায় ২০ প্রজাতির মতো বাণিজ্যিক আকারে মাছ ধরা হয়। কারণ এসব মাছের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগর থেকে খাদ্য হিসাবে দুইশ প্রজাতির মাছ ও চিংড়ি মিলিয়ে ৪০টির মতো মাছ নিয়মিত ধরে জেলেরা।

উপকূলীয় জেলা সদর ভোলার কাঁচিয়া মৎস্য বন্দরের আড়ৎদার আবুল হাসেম, মহিউদ্দিন ও রাব্বানী মাঝি বাসস’কে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় নদী আর সাগরের-দুই ধরনের মাছই পাওয়া যায়। আমরা সাগরের মাছটা বেশি পছন্দ করি। কারণ, এটা খেতে সুস্বাদু, দামও কম। 

তারা বলেন, অন্যবারের চেয়ে সাগরে গিয়ে জেলেরা এবার কাঙ্খিত ইলিশ ও অন্যান্য প্রজাতির মাছ পেলে তাদের আর দারিদ্র্যতা  থাকবেনা।

ভোলার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন বাসস’কে বলেন, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের মাছ ধরার সীমানার একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলে (Exclusive Economic Zone)  এবার জেলেরা বিপুল পরিমাণে ইলিশ ও অন্যান্য প্রজাতির মাছ আহরণের সম্ভাবনা রয়েছে। 

তিনি বলেন, সমুদ্রসীমার পরিধি বা ভিত্তিরেখা (baseline)  থেকে দুইশ' নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় বাংলাদেশের মাছ আহরণ ও সম্পদ ব্যবহারের একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে। সেই আলোকে ভোলা উপকূলের জেলেরা যাতে নির্বিঘ্নে মাছ আহরণ করতে পারেন সেজন্য তাদেরকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেবে সরকার। 

তিনি আরও বলেন, সাগরে সঠিক নিয়ম অনুসরণ করতে পারলে এবার মৌসুমে পুরো উপকূলীয় জেলাগুলোর জেলেরা গতবারের চেয়ে কয়েক লাখটন ইলিশ ও অন্যান্য প্রজাতির মাছ আহরণ করতে পারবেন।