শিরোনাম

রাজশাহী, ২৬ মে, ২০২৬ (বাসস) : পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে রাজশাহীর গবাদিপশুর হাটগুলো ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে। শেষ মুহূর্তের কেনাবেচায় জমে উঠেছে মহানগরী ও আশপাশের উপজেলার হাটগুলোও। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে এ কর্মযজ্ঞ।
গত বছরের তুলনায় এবার গরুর দাম তুলনামূলক সহনীয় পর্যায়ে থাকায় সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে। একই সঙ্গে দেশীয় খামারিরাও ভালো বিক্রির আশা করছেন। তবে সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশের আশঙ্কা এখনও পুরোপুরি কাটেনি তাদের মধ্যে।
রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিটি হাট ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই ট্রাকভর্তি গরু, ছাগল ও ভেড়া নিয়ে হাটে আসছেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা। রাজশাহীসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা মানুষের ভীড়ে হাট এলাকায় পা ফেলার জায়গা নেই।
হাটজুড়ে সবচেয়ে বেশি চাহিদা মাঝারি আকারের দেশি গরুর। অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ক্রেতা এক থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে গরু কিনতে আগ্রহী। তুলনামূলক বড় আকারের গরু বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে দুই লাখ ২০ হাজার টাকায়। অন্যদিকে, ছোট আকারের গরুর দাম ৬৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকার মধ্যে।
রাজশাহীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা সহিমুদ্দিন সিটি হাট থেকে গরু কিনে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাজেট নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলাম। তবে এবার দাম সহনীয়। এক লাখ ৩৩ হাজার টাকায় ভালো গরু কিনেছি। পরিবারের সবাই পছন্দ করেছে।’
আব্দুল্লাহ আল মামুন নামের আরেক ক্রেতা বলেন, ‘গতবারের তুলনায় এবার দেশি গরুর সংখ্যা বেশি। দরদাম করার সুযোগও আছে। আগে যে গরুর দাম দেড় লাখ টাকা চাওয়া হতো, এবার তা এক লাখ ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে।’
খামারি ও ব্যবসায়ীরাও বলছেন, এবার বাজার মোটামুটি ভালো যাচ্ছে। যদিও পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও লালন-পালনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। তারপরও শেষ পর্যন্ত ন্যায্য দাম পেলে লোকসানের আশঙ্কা থাকবে না।
সিটি হাটে কয়েকটি গরু নিয়ে আসা খামারি আমিনুর রহমান বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে গরু পালন করেছি। খাবারের দাম বেড়েছে, খরচও বেশি। তবে আল্লাহর রহমতে বেশিরভাগ গরু বিক্রি হয়ে গেছে। লাভ খুব বেশি না হলেও লোকসান হয়নি।’
চারঘাট উপজেলার গরু ব্যবসায়ী জিলানী বলেন, ‘শুরুর দিকে সীমান্ত দিয়ে কিছু ভারতীয় গরু আসার খবর ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় দেশি খামারিরাই এবার বাজার ধরে রেখেছেন।’
তবে অনেক খামারির মধ্যে এখনও ভারতীয় গরু নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তাদের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে বিভিন্ন পথে ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ করছে, যা স্থানীয় খামারিদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আশরাফ হোসেন বলেন, ‘হাটে ভারতীয় গরুর সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। এতে দেশি গরুর প্রতি আগ্রহ কমে যায়। আমরা যারা বেশি খরচ করে খামার করেছি, তারা লোকসানের ভয় পাচ্ছি।’
আরেক বিক্রেতা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘চারটি গরু এনেছিলাম। একটি এক লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। আশা ছিল আরও বেশি পাব। তবে বাজারে গরু বেশি থাকায় লাভ কম হয়েছে।’
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবার রাজশাহীতে কোরবানির পশুর কোনো ঘাটতি নেই। বরং চাহিদার তুলনায় বিপুলসংখ্যক পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে মোট ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১১টি পশু। এর মধ্যে ১ লাখ ৪ হাজার ৮৪১টি গরু, ৩ হাজার ৪২৫টি মহিষ, ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৩৯টি ছাগল এবং ৪৩ হাজার ৪০৬টি ভেড়া রয়েছে। অন্যদিকে জেলার মোট চাহিদা প্রায় ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৮টি পশুর। সে হিসাবে প্রায় ৯২ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা রয়ছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আতোয়ার রহমান বলেন, ‘একসময় ভারতীয় গরুর কারণে স্থানীয় খামারিরা বড় ক্ষতির মুখে পড়তেন। এবার সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, যাতে অবৈধভাবে গরু প্রবেশ করতে না পারে।’
তিনি জানান, স্থানীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর নজরদারিতে রয়েছে।
এদিকে শুধু কেনাবেচাই নয়, পশুর হাটে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবাও জোরদার করা হয়েছে। রাজশাহী সিটি হাটের ইজারাদার শওকত আলী জানান, পুরো হাট এলাকায় সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক দলও কাজ করছে। জাল টাকা শনাক্তে বিশেষ মেশিন রাখা হয়েছে এবং কয়েকটি ব্যাংকের বুথ চালু রাখা হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ আরও জানিয়েছে, ঈদ উপলক্ষে রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলায় ১৬১টি স্থায়ী ও ১৪১টি অস্থায়ী পশুর হাট বসেছে। এসব হাটে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে ২১৩টি ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। তারা পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, গাভির গর্ভ পরীক্ষা এবং অসুস্থ পশুর চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে এবারের ঈদ বাজারে রাজশাহীর পশুর হাটগুলোতে স্বস্তির আবহ বিরাজ করছে। ন্যায্য দামে কেনাবেচা, পর্যাপ্ত দেশীয় পশুর সরবরাহ, বাড়তি নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার কারণে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ।