বাসস
  ২০ মে ২০২৬, ১৪:১৬

ব্যক্তি উদ্যোগে সরকারি খাল খননে নতুন নির্দেশনা ভূমি মন্ত্রণালয়ের

ঢাকা, ২০ মে, ২০২৬ (বাসস): দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, দখল এবং ভরাটের কারণে দেশের অসংখ্য খাল নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে|

ফলে জলাবদ্ধতা, বন্যা এবং পানি নিষ্কাশন সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে| এ অবস্থায় সরকারি খাল পুনঃখননে ব্যক্তি উদ্যোগকে সম্পৃক্ত করতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে সরকার|

সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ স্বাক্ষরিত  এক পরিপত্রে এ নির্দেশনা জারি করা হয়|

এতে বলা হয়েছে, খেয়াঘাট বা ব্যক্তি উদ্যোগে সরকারি খাল খননের মাধ্যমে খননকৃত মাটি ও বালি অপসারণের সুযোগ দেওয়া হবে| এতে একদিকে খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্থানীয় উন্নয়ন কাজেও মাটি ও বালির চাহিদা পূরণ হবে|

পরিপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, দেশের খাল খনন সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচির অংশ|

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ খাল খনন কার্যক্রম পরিচালনা করছে| কিন্তু এখনও অনেক ছোট ও মাঝারি খাল পুনঃখননের বাইরে রয়ে গেছে|

পরিপত্রে জানানো হয়, সড়ক নির্মাণ, স্কুল-কলেজ স্থাপন, মাঠ ভরাট, বসতভিটা উন্নয়ন ও ইটভাটাসহ বিভিন্ন কাজে বিপুল পরিমাণ মাটি ও বালির প্রয়োজন হয়|

এই চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি খাল খননে সম্পৃক্ত করা হবে| তবে পুরো কার্যক্রম কঠোর প্রশাসনিক তদারকির আওতায় পরিচালিত হবে|

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজ ব্যয়ে খাল খনন ও খননকৃত মাটি-বালি অপসারণের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আবেদন করতে পারবে|

আবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট খাল সরেজমিনে পরিদর্শন করে কতটুকু খনন প্রয়োজন, সে বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার মতামতের ভিত্তিতে একটি প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হবে|

প্রাক্কলনে খালের ˆদর্ঘ্য, প্রস্থ, গভীরতা এবং কত পরিমাণ মাটি বা বালি উত্তোলন করা যাবে তা উল্লেখ থাকবে|

একই খালের জন্য একাধিক আবেদন জমা পড়লে আলোচনা বা লটারির মাধ্যমে খননকারী নির্বাচন করা হবে|

বড় খালের ক্ষেত্রে খণ্ডে ভাগ করে একাধিক আবেদনকারীকে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে|

পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, অনুমোদিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খনন কাজ সম্পন্ন করতে হবে এবং খননকৃত মাটি, বালি, আগাছা ও অন্যান্য বর্জ্য খালের অন্তত ১০ মিটার দূরে সরিয়ে ফেলতে হবে|

কাজ শেষে উপজেলা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র নিতে হবে|

এতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, অনুমোদিত নকশা বা প্রাক্কলনের বাইরে অতিরিক্ত খনন করা যাবে না|

যদি অতিরিক্ত খননের কারণে পার্শ্ববর্তী জমি, স্থাপনা বা সম্পদের ক্ষতি হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে|

এ ধরনের বিরোধ দেখা দিলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন এবং তার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে|

সরকারি নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, খননকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান খননকৃত মাটি নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার বা বিক্রি করতে পারবে|

এ জন্য সরকার, উপজেলা পরিষদ বা অন্য কোনো সংস্থাকে কোনো প্রকার ফি বা মূল্য পরিশোধ করতে হবে না|

তবে পুরো কার্যক্রম স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির মধ্যে থাকবে|

এ বিষয়ে উপজেলা কানুনগো, সার্ভেয়ার এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে| অনুমোদন অনুযায়ী খনন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কি না তারা সেটি নিশ্চিত করবেন|

পাশাপাশি সরকারি কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় থাকা খালে ব্যক্তি উদ্যোগে খননের অনুমতি দেওয়া হবে না বলেও পরিপত্রে স্পষ্ট করা হয়েছে|

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন ধরে ভরাট হয়ে থাকা ছোট ছোট খাল পুনরুদ্ধারে গতি আসবে|

বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষিজমিতে পানি নিষ্কাশন এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে|

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও পরিকল্পনাহীন দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে বহু খাল হারিয়ে যাচ্ছে| এতে একদিকে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে নগর ও গ্রামীণ এলাকায় জলাবদ্ধতা বাড়ছে|

তাই খাল পুনঃখনন কার্যক্রমকে টেকসই করতে স্থানীয় জনগণ ও বেসরকারি উদ্যোগকে সম্পৃক্ত করা সময়োপযোগী পদক্ষেপ|

তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, ব্যক্তি উদ্যোগে খাল খননের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে|

যাতে অতিরিক্ত মাটি উত্তোলন, অবৈধ বালু বাণিজ্য বা পরিবেশের ক্ষতি না ঘটে|

স্থানীয় প্রশাসন ও ভূমি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে|

জন¯^ার্থে জারি করা এ নির্দেশনা অবিল¤ে^ কার্যকর হবে বলে পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে|

ভূমি মন্ত্রণালয় আশা করছে, নতুন এ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল পুনরুদ্ধার কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে|