শিরোনাম

শফিকুল ইসলাম বেবু
কুড়িগ্রাম, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ (বাসস) : তিস্তা নদীর অব্যাহত ভাঙনে কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা আবারও হুমকির মুখে পড়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এর ফলে জীবন-জীবিকা হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী মানুষেরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে বাসস’কে বলেন, ভাঙনের কারণে প্রতিদিনই তারা কৃষিজমি হারাচ্ছেন। ভুট্টা, ধানসহ বিভিন্ন ফসলি জমি নদীতে বিলীন হওয়ায় জীবিকা সংকটে পড়েছেন তারা। অনেক বসতবাড়ি এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
তিস্তা নদীর উৎপত্তি ভারতের সিকিমে। প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের পর এটি নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুরে ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়েছে। এ নদীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৫ কিলোমিটার।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, জেলার তিস্তা নদীর প্রায় ৪৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনপ্রবণতা রয়েছে। এর মধ্যে রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ারডাঙ্গা ইউনিয়নের রামহরি এলাকায় ৪০০ মিটার, নাজিমখান ইউনিয়নের একটি অংশে ৫০০ মিটার, উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের চাপড়ারপাড়ে ১ হাজার মিটার, সাদুয়ারদামারহাটে ৫০০ মিটার এবং বজরায় ৭০০ মিটার এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, বছরের পর বছর নদীভাঙনে সব কিছু হারিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়লেও কার্যকর কোনো স্থায়ী সমাধান মিলছে না। শুধু অস্থায়ীভাবে বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল দিচ্ছে না। আর তাই সব কিছু হারিয়ে এখন তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের পলাশপুর গ্রামের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন বাসস’কে বলেন, ‘প্রতিদিনই নদী আমাদের জমি গ্রাস করছে। এখন ঘরবাড়িও ঝুঁকিতে। পরিবার নিয়ে কোথায় যাব বুঝতে পারছি না।’ একই এলাকার গৃহিণী রহিমা বেগম বলেন, ‘ভাঙনের ভয়ে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারি না। প্রতিবারই কাজের আশ্বাস পাই, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখি না।’
কৃষক মোকসেদ আলী বাসস’কে বলেন, ‘আমার চাষের জমি নদীতে চলে গেছে। আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা দ্রুত স্থায়ী সমাধান চাই।’
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন জরুরি। এতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বাসস’কে বলেন, তিস্তা নদীর ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বাসস’কে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং জরুরি ভিত্তিতে এক লাখ জিও ব্যাগে বালু ভর্তি করে ভাঙনরোধে ফেলা হবে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা বলেন, প্রতিবছর একই ধরনের আশ্বাস দেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো টেকসই উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রতি বছরই নতুন করে মানুষ নদীভাঙনের শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। তাই সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নদীভাঙন রোধের ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাই।