বাসস
  ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:১৬

গোপালগঞ্জে বাম্পার ফলনে আশা জাগিয়েছে ‘ব্রি-১০৮’

জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল উফশী নতুন জাত ব্রি-১০৮ ধানের অধিক ফলন হয়েছে। ছবি : বাসস

লিয়াকত হোসেন লিংকন

গোপালগঞ্জ, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলন হয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল উফশী ধানের নতুন জাত ব্রি-১০৮। ধানের উচ্চ ফলন, চালের গুণগত মান ও বাজার দর ভালো হওয়ায় দিন দিন ব্রি-১০৮ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন কৃষকরা।

১৪৯-১৫১ দিনের মধ্যে ফসল কাটা যায়। সঠিক পরিচর্যা করলে হেক্টর প্রতি ৮ দশমিক ৭ টনের বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব। প্রচলিত জাতের চেয়ে রোগবালাই ও পোকা মাকড়ের আক্রমণ অনেক কম হয়। যে কারণে কৃষক এ জাতের ধান চাষের দিকে ঝুঁকছেন। বোরো মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ফলন দিতে সক্ষম। চিকন এই জাতের ধান চাষাবাদ সম্প্রসারিত হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গোপালগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আমিনা খাতুন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসস’কে এই তথ্য জানিয়েছেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, আমরা ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল এবং হাইব্রিড ধান নিয়ে গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট ও নড়াইল জেলায় কাজ করছি। চলতি বোরো মৌসুমে ৩ জেলায় ৬৩ হেক্টর জমিতে ব্রি-১০৮ ধানের আবাদ হয়েছে।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বোড়াশী গ্রামের কৃষক রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাসের জমিতে উৎপাদিত ধান কেটে পরিমাপ করে দেখা গেছে, প্রতি শতাংশে ফলন হয়েছে প্রায় ৩৫ কেজি। সেই হিসেবে ৫২ শতাংশের এক বিঘা জমিতে শুকনো অবস্থায় ধান পাওয়া গেছে ৪৫ মণেরও বেশি। অধিক ফলন ও বাজারে ভালো দাম থাকায় এই ধান চাষ কৃষকদের জন্য নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। তাই বোরো মৌসুমে দেশের ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন ঘটিয়ে চলছে ব্রি-১০৮ ধান।

গোপালগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. রোমেল বিশ্বাস বলেন, ‘ব্রি-১০৮ বোরো মৌসুমের একটি উচ্চ ফলনশীল ও পুষ্টি সমৃদ্ধ চিকন চালের জাত। পূর্ণ বয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা ১০২ সে.মি.। এর পাতা খাড়া ও গাঢ় সবুজ রঙের। গাছ হেলে পড়া সহিষ্ণু। 

অনুকূল পরিবেশ ও সঠিক পরিচর্যায় এটি হেক্টর প্রতি ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। এ জাতের গড় জীবনকাল সাধারণত ১৪৯ থেকে ১৫১ দিন। ২০২৪ সালে এই ধানের জাত প্রথম চাষ করা হয়। ব্রি’র গোপালগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের আওতায় গোপালগঞ্জ, নড়াইল ও বাগেরহাট জেলায় পরীক্ষামূলক ও বাণিজ্যিকভাবে আবাদ শুরু হয়েছে।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বোড়াশী গ্রামের কৃষক রবীন্দ্রনাথ বিশ^াস বলেন, ‘আগে স্থানীয় জাতের ধান আবাদ করে বিঘায় মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ মণ ফলন পেতাম, এতে সময় লাগত ১৬০ দিন। কিন্তু এই বছর কৃষি বিভাগের পরামর্শে প্রথমবারের মতো ব্রি-১০৮ আবাদ করেছি। মাত্র ১৪৯ দিনে এই ধান ঘরে তুলতে পেরেছি এবং বিঘায় ফলন পেয়েছি ৪৫ মণ। বিঘায় মাত্র ১৫-২০ হাজার টাকা খরচে এই ফলন পেয়েছি। আগামীতেও এই ধান আবাদ করবো।’

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বোড়াশী ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিনোদিনী সিকদার বলেন, ‘আমার ব্লকে এই প্রথম ব্রি ধান ১০৮ ধানের চাষ হয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এলএসটিডি-ব্রি প্রকল্পের আওতায় ৫টি প্লট করেছিল। প্রতিটি প্লটেই ধানের বাম্পার ফলন হয়। প্রচলিত জাতগুলোর তুলনায় এই ধানের ফলন অনেক বেশি, যা কৃষকদের জন্য নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। এই জাতটি কৃষকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মাঠ পর্যায়ে এর সাফল্য দেখে কৃষকরা এখন ব্রি ধান ১০৮ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) থেকে প্রয়োজনীয় বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে আগামী বছর আমরা এই ধানের চাষাবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে।’

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাফরোজা আক্তার বাসস’কে বলেন, ‘বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত ব্রি-১০৮ বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত। এই ধানের প্রতি গোছায় কুশির সংখ্যা গড়ে ১৬-১৭টি, যা অধিক ফলনের প্রাথমিক ভিত্তি নিশ্চিত করে। ব্রি-১০৮ কেবল ফলনেই সেরা নয়, গুণগত মানেও ভালো। এই ধানের দানার পুষ্টি শতকরা ৮৮ দশমিক ৬ ভাগ। ফলে চিটার পরিমাণ খুবই কম। চালে প্রোটিনের পরিমাণ ৮দশমিক ৮শতাংশ, যা প্রচলিত অনেক জাতের তুলনায় বেশি। এটি কেবল ক্ষুধা নিবারণ নয়, মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণেও বড় ভূমিকা রাখবে। প্রচলিত জাতের তুলনায় ব্রি-১০৮ হেক্টর প্রতি অনেক বেশি ফলন দেয়। রোগবালাই ও প্রতিকূলতা সহনশীল হওয়ার কারণে কৃষকদের উৎপাদন খরচ কম এবং মুনাফার হার বেশি। ইতোমধ্যে কৃষকদের মাঝে এই জাতটি নিয়ে বেশ সাড়া পড়েছে। ব্রি-১০৮এর চাষাবাদ দ্রুত ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ।’