শিরোনাম

রাঙামাটি, ১২ এপ্রিল ২০২৬ (বাসস) : জেলার কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৪টি ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বর্ষবরণ ও প্রধান ধর্মীয় উৎসব বৈসাবি উৎসব শুরু হয়েছে।
আজ রোববার ভোরে পাহাড়ি নারীরা বুনো ফুল সংগ্রহ করে চলে আসেন কাপ্তাই হ্রদে। সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ প্রার্থনা করে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসিয়ে দেন তারা। পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে এই ফুল ভাসানোর উৎসবে অংশ নেন পাহাড়ি মানুষ।
পুরাতন বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করতে ফুল ভাসানোর মধ্যে দিয়েই তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের সূচনা করা হয়। এটি পাহাড়ে বৈসাবি উৎসব নামে উদ্যাপন করা হলেও, বর্তমানে এই উৎসব পাহাড়ে বসবাসরত সব সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘বিজু উৎসব’ নামেই উদ্যাপন করা হচ্ছে। ভিন্ন ভিন্ন নৃ-গোষ্ঠী একে বিজু, বৈসু, সাংগ্রাই, বিহু, চাংক্রান, বিষু, সাংলান, চাংক্রাই ও পাতা উৎসব নামে এ উৎসব উদ্যাপন করে থাকে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়িদের সবচেয়ে বড় এই সামাজিক উৎসবকে ঘিরে পাহাড়ে এখন খুশির আমেজ। তিন দিনের বিজু উৎসবকে ঘিরে আনন্দে মেতেছে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষ।

বিজু উপলক্ষে আজ কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসাতে আসা চাকমা তরুণী রিপা চাকমা বাসসকে বলেন, পুরাতন বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করাসহ দেশ ও জাতির কল্যাণে আমরা আজ ভোরে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসিয়েছি।
তিনি বলেন, আজ বিজুর প্রথম দিন চাকমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী ফুল বিজু, বৈসু কিংবা বিষু হিসেবে পালন করে। এদিন আমরা বন থেকে ফুল আর নিম পাতা সংগ্রহ করি। গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা করি। এদিন আমরা ফুল দিয়ে ঘর সাজাই।
প্রতিবছর ১২ এপ্রিল (২৯ চৈত্র) থেকে বিজু উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও, এপ্রিলের প্রথম থেকেই পাহাড়ে শুরু হয়ে যায় বিজু উপলক্ষে নানা আয়োজন।
বৈসাবী উৎসব পার্বত্য এলাকার ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় উৎসব হলেও পাহাড়ে এটা সব সম্প্রদায়ের মানুষের এক মহা মিলনমেলা। বৈসাবীর মেলায় অংশ নেন পাহাড়ি-বাঙালিসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ।
এই উৎসবে পাহাড়িদের সাথে উৎসবে মেতে ওঠেন বাঙালিরাও। উৎসবে অংশ নেয়া বাঙালি তরুণী মনি বাসসকে বলেন, বিজু উৎসবে পাহাড়িদের সাথে আমরা বাঙালিরাও আনন্দে মেতে উঠি।
আগামীকাল ১৩ এপ্রিল ‘মূল বিজু’ পালিত হবে। ঐতিহ্যবাহী পাঁজন রান্না করে অতিথি আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মূল বিজুর আনুষ্ঠানিকতা। আগামী ১৪ এপ্রিল পালিত হবে গোজ্যেপোজ্যে।
এই উৎসবে পিছিয়ে নেই বাঙালিসহ অন্যান্য ভাষাভাষীর মানুষও। বিজু উৎসবকে ঘিরে জেলা শহরের প্রত্যন্ত এলাকায় চলছে পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী খেলাসহ নানা আয়োজন।
রাঙামাটি বিজু উৎসব উদ্যাপন কমিটির সদস্য সচিব ইন্টু মনি তালুকদার বাসসকে জানান, চৈত্র সংক্রান্তিতে পুরাতন বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করতে পাহাড়ে এখন বিজু উৎসবের আমেজ বইছে।

তিনি বলেন, বিজু উৎসব উপলক্ষে সকালে রাজবাড়ি ঘাটে কাপ্তাই হ্রদে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসিয়ে উৎসবের সূচনা করেছি। পুরাতন বছরের গ্লানি ভুলে ভবিষ্যতে সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায় আমরা সবাই প্রার্থনা করেছি। আগামী বছরগুলোতে যেন বিশ্বের সব মানুষ ভালো থাকে এবং পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেতুবন্ধন সুদৃঢ় থাকে এটাই সবার প্রত্যাশা।
পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র-নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর এই উৎসব তিনটি আলাদা নামে হলেও সমতলের মানুষের কাছে তা বিজু নামে পরিচিত। রজলা শহরের পাশাপাশি জেলার ১০টি উপজেলায়ও বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিজু উৎসব পালিত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আগামীকাল ১৩ এপ্রিল উৎসবে দ্বিতীয় দিন চৈত্র সংক্রান্তির দিনকে বলা হয় মূল বিজু, বৈসু বা বিষুু। এদিন তারা ঘরে ঘরে ঐতিহ্যবাহী পাচনসহ অন্যান্য খাবার রান্না করেন। আর ১৪ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত চলে মারমাদের জলকেলি উৎসব। আর বর্ষবরণের নানা আয়োজন।
আগামী ১৭ এপ্রিল রাঙামাটির চিং হ্লা মং মারী স্টেডিয়ামে মারমাদের বৃহত্তম জলকেলি উৎসবের মধ্য দিয়েই রাঙামাটিতে সমাপ্তি হবে পাহাড়ের বিজু উৎসব।
তবে মাসব্যাপী এই উৎসব রাঙামাটির গ্রামে গ্রামে অনুষ্ঠিত হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিজু উৎসব এবং বাঙালিদের বর্ষবরণের নানা আয়োজনে সম্প্রীতির রঙে রঙিন ও বর্ণিল হয়ে উঠবে পাহাড়।